এক সময় শীতের রাতে গ্রামে গ্রামে বাড়ির উঠোনগুলোতে বাঁশের সঙ্গে সামিয়ানা টানিয়ে মঞ্চ তৈরি করা হতো। মঞ্চের সামনে বাঁশে ঝোলানো থাকতো হারিকেন বা হ্যাজাক বাতি। মঞ্চস্থ হতো বিভিন্ন কাহিনী নির্ভর যাত্রাপালা। হারিকেন বা কুপি জ্বালিয়ে, শীতের চাদর অথবা কাঁথা গায়ে মুড়িয়ে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, নারী-পুরুষ, শিশুসহ সপরিবারে দেখতে যেতো এসব যাত্রাপালা। মঞ্চের সামনে মাটিতে বিছানো শুকনো খড়ে বসে উপভোগ করতো যাত্রাপালা। রাতভর চলতো রাজা-বাদশাহসহ বিভিন্ন কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে লেখা জনপ্রিয় যাত্রাপালাগুলো।
দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় এমন সব যাত্রাপালা সপরিবারে রাতভর উপভোগ করতো গ্রামের মানুষ। এমন যাত্রাপালার খবর শুনে শহরের অনেকেই আবার থাকতে না পেরে ছুটে যেতেন গ্রামে।
সময়ের বিবর্তনে গ্রামগুলোতে আজ আর সেসব দিন না থাকলেও রোববার রাতে সেরকমই কিছুটা আমেজ ছিল গাইবান্ধা জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনের মঞ্চে। এদিন লেখক ও নাট্যকর্মী ময়নুল হোসেনের রচনা ও নির্দেশনায় এই মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে আধুনিক কাল্পনিক যাত্রাপালা ‘চন্দনমালা’।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে শুরু হওয়া পালাটিতে অভিনয় শিল্পীদের সংলাপ ও মিউজিকের সাথে সাথে দুই শতাধীক দর্শকের মুহুর্মুহু করতালিতে মুখরিত ওঠে।
শহরের চার দেয়ালের মাঝে আয়োজিত এ যাত্রাপালায় কোনো কমতি ছিল না। দর্শকদের ভিড়ে শিল্পকলার মিলনায়তনের আসনগুলো ছিল কানায়-কানায় পূর্ণ। এরপরও আনতে হয়েছে অতিরিক্ত চেয়ার। আসন না পেয়ে দাঁড়িয়েও ছিলেন অনেকে। তবুও তারা যাত্রাপালা দেখার আনন্দটা মিস করতে চাননি। সাংস্কৃতিক কর্মীদের পাশাপাশি এ যাত্রাপালা দেখতে এসেছিলেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গৃহিনী, চাকরিজীবী ও সাংবাদিকসহ নানান শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে মঞ্চস্থ হয় যাত্রাপালা ‘চন্দনমালা’। সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো মঞ্চে মঞ্চস্থ ‘চন্দনমালা’ দর্শকরা উপভোগ করেছেন গ্রামের সেই বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ জনপ্রিয় যাত্রাপালার মতোই।
২৩ জন যাত্রাশিল্পীর সঙ্গে এতে অভিনয় করেছেন নাট্যকর্মীরাও।
যাত্রাপালা দেখতে আসা গাইবান্ধা থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম বাবু বলেন, নতুন কিছু অভিনয় শিল্পীদের নিয়ে খুব কম সময়ের মহড়ায় অল্প সময়ে যাত্রাপালাটির মঞ্চায়ন দর্শকদের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘদিন পরে বিলুপ্তপ্রায় এমন যাত্রাপালা সত্যিই আমাদের সকলকে অনেক আনন্দ দিয়েছে। গ্রামীণ এ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আগামীতেও এমন যাত্রাপালা নিয়মিত মঞ্চস্থ করা দরকার।
‘চন্দনমালা’ যাত্রাপালার কাহিনী হচ্ছে : অত্যাচারী মুরাদপুরের রাজার হাতে একটি পরিবার তছনছ হয়ে যাওয়ার পর বেঁচে যাওয়া এক ছেলে গড়ে তোলে একটি ডাকাতের দল। পরে সেই অত্যাচারী রাজার মৃত্যুর পর তার ছোট ভাইকে রাজা হিসেবে রাজ্যের দায়িত্বভার দেয়া হলে তিনি মুরাদপুর রাজ্যের একজন জনহিতকারী রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
এ সময় এক স্কুল মাস্টারের কন্যার সঙ্গে গড়ে ওঠে রাজপুত্রের ভালোবাসার সম্পর্ক। একদিন রাজপুত্র সেই ডাকাতের কাছে ডাকাতি ও হত্যা বন্ধ করার প্রস্তাব নিয়ে গেলে রাজ প্রসাদে সহ-সেনাপতি ও মন্ত্রীদের সহযোগিতায় উজিরকে রাজা ঘোষণা করা হয়। রাজা ও রানীকে বন্দি করার খবর ডাকাতের আস্তানায় রাজপুত্র ও ডাকাত সরদারকে বলা হলে তারা দলবলে এসে উজির ও সহ-সেনাপতিদের পরাজিত করে। আবার রাজ্যভার ফিরে পায় জনহিতকারী রাজা।
যাত্রাপালাটিতে রাজার চরিত্রে অভিনয় করেছেন মকছুদ আলম লাল, রাজপুত্র বাউল খোকন সরকার, উজির তারিকুল ইসলাম, সেনাপতি রিজু মিয়া, সহ-সেনাপতি শহিদুল্যাহেল কবির ফারুক, চন্দনের বন্ধু সোহেল রানা, স্কুল মাস্টার নুর মোহাম্মদ, স্কুল মাস্টারের পুত্র লিটন সরকার, গৌতমের বন্ধু বাউল সেলিম, দস্যু সরদার সাজ্জাদ সরকার সাজু, দস্যু সরদারের সহচর আবু সায়েম মো. সেরাজুল হক, বাউল জাহিদ হোসেন জছি, মসজিদের ইমাম ময়নুল হোসেন, রাজ রানী নাজমিন বেগম মিনি, স্কুল মাস্টারের কন্যা লাকি ইনাম ফাহিম ও নর্তকী মাধবী রানী সরকার।
এ ছাড়া রক্ষী চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাহিন, মুরাদ, ফরহাদ, সাইফুল এবং মন্ত্রীবর চরিত্রে জান্নাতুল ফেরদৌস জাহিদ, ইয়াছিন ও ছালাম। রুপসজ্জায় ছিলেন ময়নুল হোসেন ও আলো জিয়াউর রহমান জিয়া।
পোশাকে গোবিন্দগঞ্জের সৌখিন নাট্য সংস্থা, মিউজিকে সখিনা ব্যান্ড পার্টি ও টাইপোগ্রাফিতে ছিলেন খোন্দকার নিপন ও যাত্রাপালা মঞ্চায়ন উপ-কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন চুনি ইসলাম।
মঞ্চে যখন যাত্রাপালার সংলাপ চলছিল তখন উচ্ছ্বসিত দর্শকরা করতালি ও শীষ দিতে থাকেন। পালা চলে রাত ৯টা পর্যন্ত।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির সদস্য অমিতাভ দাস হিমুনের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক সেবাষ্টিন রেমা। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক প্রমতোষ সাহা এবং লেখক ও নাট্যকর্মী ময়নুল হোসেন।
জেলা প্রশাসক সেবাষ্টিন রেমা তার বক্তব্যে সুন্দর অভিনয়ের জন্য অভিনয় শিল্পীসহ সকল কলাকুশলীকে ধন্যবাদ জানান। আগামীতে এ ধরনের দর্শকনন্দিত যাত্রাপালা আরও মঞ্চস্থ হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক।
রওশন আলম পাপুল/এমবিআর