দেশজুড়ে

২০ বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া জমি নিজেদের দাবি পুলিশের

২০ বছর আগে উদীচী ট্র্যাজেডিতে নিহত শেখ নাজমুল হুদা তপনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিহত তপনের পরিবারের জন্য যশোর শহরের গাড়িখানা এলাকায় ৫ শতক জমি বরাদ্দ দেন তিনি। ১৯ বছর পর সেই জমি নিজেদের দাবি করে আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেছে পুলিশ। নিহত তপনের পরিবারকে আদালত কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছে। অসহায় পরিবারটি এখন আর ওই জমিতে যেতে পারছে না। তাই জমি বুঝে পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন নিহত তপনের পরিবার।

বুধবার দুপুরে প্রেসক্লাব যশোর মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানান তারা। সংবাদ সম্মেলনে তপনের ভগ্নিপতি মাহফুজুল হক নান্নু বলেন, ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোর টাউন হল ময়দানে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে বোমা হামলায় নাজমুল হুদা তপনসহ ১০ জন নিহত হন। তপন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উর্পাজনক্ষম ব্যক্তি। তপন নিহত হওয়ার পর তার মা শামছুন্নাহার তিন মেয়ে ও বেকার তিন ছেলে নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন।

ঘটনার পরদিন ৭ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রফিকুল ইসলাম নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে যশোর আসেন। তিনি নিহত শহীদ তপনের বাড়ি যান। এসময় তপনের বৃদ্ধা মা শামছুন্নাহার ও পরিবারের সদস্যরা মন্ত্রীর কাছে তাদের মাথা গোঁজার জন্য আবাসনের দাবি জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি অবহিতও করেন।

প্রাধানমন্ত্রীর তৎকালীন একান্ত সচিব র.আ.ম উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট দফতরসমূহকে আবেদনকারীর নামে গাড়িখানার প্লট নং ৯৫। ৩৯৫/৭৩ নং (৫ শতক পরিমাণ) সরকারি পরিত্যক্ত বাড়িটি বরাদ্দের জন্য নির্দেশ দেন।

নিহত তপনের মা শামছুন্নাহারের আবেদনের প্রেক্ষিতে পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা সভায় ৩৯৫/৭৩নং বাড়িটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৬ টাকা মূল্যে বিক্রয়ের জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বাড়িটি শামছুন্নাহারের নিকট বিক্রয়ের প্রস্তাব দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরকে অনুরোধ করা হয়। ওই সভায় যশোরের পুলিশ সুপারের প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন।

পরবর্তীতে তপনের মা বাড়ির মূল্যের প্রথম কিস্তির ২৫ হাজার টাকা জমা দেন। এরপর জামায়াত-বিএনপির সরকার ক্ষমতায় এসে কিস্তির টাকা নেয়া বন্ধ করে দেয়। এরই মধ্যে চক্রবৃদ্ধি হারে ৫২ হাজার টাকা সুদ হয়। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়ার পর সুদসহ বাকি সমুদয় টাকা শামছুন্নাহার পরিশোধ করে বাড়ির দলিল করে নেন।

মাহফুজুল হক নান্নু আরও বলেন, গণপূর্ত বিভাগের পরিত্যক্ত বাড়িটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে সংস্কার কাজ শুরু করেন। কিন্তু এ সময় যশোরের তৎকালীন পুলিশ সুপার তাদের বিরুদ্ধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। এরপর আর ওই জায়গায় আমরা যেতে পারিনি। গত ৩০ নভেম্বর নিহত তপনের ভাই খসরুজ্জামান ও মাসুদ পারভেজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে।

মাহফুজুল হক নান্নু বলেন, উদীচী ট্র্যাজেডির ঘাতকদের বিচার দাবি করছি। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বরাদ্দকৃত শহীদ পরিবারের জমি পুলিশ দাবি করছে, এটা দুঃখজনক। আদালতে পুলিশের দায়েরকৃত আবেদন প্রত্যাহার করে জমি বুঝিয়ে দেয়ার দাবি করছি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, নিহত তপনের মা শামছুন্নাহার, ভাই মাসুদ পারভেজ, বোন নাজমুস সুলতানা বিউটি, নাদিয়া সুলতানা লিপি, মুনিয়া সুলতানা ও উদীচী যশোরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহাবুবুর রহমান মজনু।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যশোর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনসার উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বরাদ্দকৃত জমি যেকোনো জায়গা থেকে তিনি পেতে পারেন। তবে পুলিশের জায়গা ভুলক্রমে ওই পরিবারকে বরাদ্দ দেয়া হতে পারে। এজন্য হয়তো আদালতে পুলিশের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে। তবে ওই আবেদনে কী দাবি করা হয়েছে সে বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি ওই ঘটনার পরে যশোরে যোগদান এসেছি।

মিলন রহমান/এফএ/জেআইএম