মতামত

রাতে মশা দিনে মাছি, এই নিয়ে ঢাকায় আছি

দুদিন আগে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মামুন মোর্শেদের রুমে বসেছিলাম। এমন সময় সেখানে এলেন মেডিসিন বিভাগের একজন ডাক্তার। তিনি জানালেন, দেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। তাদের হাসপাতালেই ভর্তি আছে ৪০ জন। এই সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। তিনি সহকারী পরিচালককে বললেন, ডেঙ্গু রোগীরা বিভিন্ন ওয়ার্ডে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তিনি ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালে একটি কর্নার করার প্রস্তাব দিলেন, যাতে ডেঙ্গু রোগীদের সমন্বিত চিকিৎসা করা সম্ভব হয়।

জানালেন, তিনি নিজেই সে কর্নারের তত্বাবধান করবেন। ডা. মামুন মোর্শেদ তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে কোথায় সেটা করা যায়, তা খুঁজতে বললেন। সেই রুমেই ডাক্তারদের আলোচনায় শুনলাম এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি, রোগীর চাপও বেশি। পত্রিকায় দেখলাম, কোনো কোনো এলাকায় এবার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ গুণ। এ বছর এখন পর্যন্ত এক ডাক্তারসহ ৩ জনের মৃত্যুর খবরও আমাদের আতঙ্কিত করেছে। ডেঙ্গুর কাছে ডাক্তারও অসহায়। ডেঙ্গু যে কত ভয়াবহ, সেটা নিশ্চয়ই আপনারা সরাসরি দেখেছেন। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল তার জীবনের প্রথম বাজেটটি সংসদে পেশ করতে পারেননি।

ডেঙ্গু হয়ে গেলে ডাক্তাররা চিকিৎসা দেন। কিন্তু ডেঙ্গুর দায় কিন্তু তাদের নয়। ডেঙ্গুর দায় আমাদের মানে নাগরিকদের। আর বড় দায় সিটি করপোরেশনের। ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস মশায়। আর এডিস মশা কোথায় বংশবৃদ্ধি করে সেটা আমরা সবাই জানি। গত অনেক বছর ধরেই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সচেতনতার কথা হচ্ছে। কিন্তু ডেঙ্গুর প্রকোপ কমছে না। ছন্দ মেলাতে রাতের মশার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এডিস মশা রাতের নয়, দিনের মশা।

জমে থাকা পরিস্কার পানিতে এডিস মশা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। তাই ডেঙ্গু থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো এডিস মশার বংশ ধ্বংস করে দেয়া। সাবধানতাগুলো খুব কঠিন নয়। বাড়ির আনাচে কানাচে পানি জমতে না দেয়া, ডাবের খোসা, ভাঙ্গা টব বা অন্য কোথাও বৃষ্টির পানি জমতে না দেয়া। তবে এবার বেশি শোনা যাচ্ছে নির্মাণযজ্ঞের কথা। ঢাকায় অনেকবছর ধরেই চলছে এই অপরিকল্পিত নির্মাণযজ্ঞ। নির্মাণকাজ চলার সময় অনেক ভাঙ্গাচোড়া জিনিস পড়ে থাকে। তার কোনটা পানি জমে থাকে কে জানে। আর নির্মাণকাজ চলার সময় সেই জায়গাটি সার চোখের আড়ালে থাকে। তাই সাথারণ মানুষেশর পক্ষে জানাই মুশকিল কোথায় এডিস মশা তার বংশবৃদ্ধি করছে। তাই আপনার ঘরকে মশামুক্ত করলেও কিন্তু আপনি নিরাপদ নন।

কোনো নির্মাণাধীন ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে বেড়ে ওঠা এডিস মশা আপনাকে কামড়াতে পারে। আমাদের সবার দায়িত্ব হলো, চারপাশে নজর রাখা, চোখ কান খোলা রাখা। তবে বড় দায়িত্বটা হলো সিটি করপোরেশনের। আমি চাইলেও আমার পাশের বাড়ির পেছনে উকি দিতে পারবো না, কোনো নির্মাণাধীন ভবনের সাইটে ঢুকতে পারবো না। কিন্তু সিটি করপোরেশন চাইলে সবদিকে খেয়াল রাখতে পারবে। তাদের মূল দায়িত্ব হলো মশা মারা। আর এই কাজটা দুই সিটি করপোরেশনকে একসাথে করতে হবে। কারণ মশা কিন্তু উত্তর-দক্ষিণ চেনে না।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে, মানে সিটি করপোরেশন ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেনি। ডেঙ্গু কিন্তু এক দারুণ সাম্যবাদী শহর তৈরি করে। ডেঙ্গু যেমন মন্ত্রীর হতে পারে, তেমনি রিকশাচালকের হতে পারে। বাড্ডার মশা বারিধারার অভিজাত মানুষকে কামড়াতে পারে, শান্তিনগরের মশা উড়ে যেতে পারে মন্ত্রিপাড়ায়। তবে এই শহর সাম্যবাদী নয়, এই শহর অভিজাত মানুষের, বড়লোকের। এই শহরে ৭ ভাগ মানুষের গাড়ি আছে, ৯৩ ভাগ মানুষেরই নেই। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের সব ভাবনা এই ৭ ভাগ মানুষকে নিয়ে।

এই যে ঢাকায় এাকের পর এক ফ্লাইওভার হচ্ছে, তার মূল সুবিধাভোগী হলো এই ৭ শতাংশ মানুষ। যানজটের কারণ কিন্তু এই ৭ শতাংশ মানুষ। আবার তাদের সুবিধার জন্যই যানজট নিরসনের চেষ্টা হয় ৯৩ ভাগ মানুষকে ভুগিয়ে। গাড়ি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হয় না, চেষ্টা হয় রিকশা নিয়ন্ত্রণের। একটা প্রাইভেট কারে একজন মানুষ অফিসে যায়। তিনটি প্রাইভেট কার একটি বাসের জায়গা দখল করে।

একটি বাসে লোক যেতে পারে ৬০ জন। তার মানে তিনজন লোক ৬০ জন লোকের জায়গা দখল করে রাখে। আপনি ওপর থেকে তাকালে দেখবেন, রাস্তায় খালি প্রাইভেট কার আর প্রাইভেট কার। দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। বাহ, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে কিছু রিকশা এই মন ভালো করা ছবিটা নষ্ট করে দেয়। তাই দেশকে আরো এগিয়ে নেয়ার সবচেয়ে বড় উপায় হলো ঢাকাকে রিকশামুক্ত করে ফেলা।

জগতকে ধুলামুক্ত করার উপায় যেমন পানি দিয়ে কাদা বানিয়ে ফেলা। উন্নয়নের আরো এক ধাপ উন্নয়ন ঘটেছে গতকাল রোববার। ঢাকার অতি ব্যস্ত তিনটি রাস্তাকে রিকশামুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। রাস্তা তিনটি হলো- গাবতলী থেকে আজিমপুর, সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে শাহবাগ এবং কুড়িল থেকে খিলগাও হয়ে সায়েদাবাদ। আমি নিশ্চিত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ঢাকা আরো দৃষ্টিনন্দন হবে, যানজট আরো অনেক কমে আসবে। ওপর থেকে ঢাকাকে আরো সুন্দর লাগবে দেখতে।

মূল রাস্তা থেকে রিকশা সরিয়ে দিলেন। কিন্তু রিকশাগুলো তো থাকলোই। তাহলে গলিতে এখন দিনভর যানজট থাকবে। থাকুক। গলিতে যানজট থাকলে ৭ ভাগ গাড়িওয়ালার কিচ্ছু যায় আসে না। একেক শহরের একেকটি বৈশিষ্ট্য থাকে। কলকাতার যেমন ট্রাম বা টানা রিকশা। ঢাকার তেমনি রিকশা। বিদেশীরা এসে রিকশায় চড়েন শখে। রিকশা অনেকেরই প্রিয় বাহন। প্রিয়জনকে পাশে বসিয়ে রিকশায় বৃষ্টিতে ভেজা তো অনেকেরই প্রিয় রোমান্টিকতা। রিকশার হুড তুলে টুকটাক ডেটিংও চলে।

তবে প্রেম বা রোমান্টিকতা নিয়ে ভাবার সময় নেই রিকশাওয়ালাদের। তাদের পেটের দায়। আর কিছু না পারলেও কোনোরকমে রিকশা টেনে পেটের ক্ষুধা মেটানো যায়। সেখানেও আপত্তি নগর পিতাদের। গরীব রিকশাওলারা কী করে খাবে, সেই চিন্তা না হয় নাই করলেন, কিন্তু যারা এই রিকশাগুলোয় চড়তেন তারা কী করবেন? মেয়ররা বলছেন, এই রাস্তাগুলোতে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট আরো বাড়ানো হবে। খুব ভালো কথা, হবে। কিন্তু যতদিন পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বাড়ানো না হবে ততদিন এই মানুষগুলো কিসে চড়বে?

তারচেয়ে আপনারা তাদের হাঁটতে বলুন। হাঁটলে স্বাস্থ ভালো থাকবে। কিন্তু হাঁটবো যে ফুটপাতগুলো একটু ক্লিয়ার করে দেন। ঢাকার ফুটপাতগুলো আসলেই হাঁটার অযোগ্য। অনেক জায়গায় ফুটপাত হলো ব্যবসায়ীদের শোরুমের এক্সটেনশন, গাড়ি মেরামতের জায়গা, মোটর সাইকেলের স্পেশাল লেন। ফুটপাতের হরেক ব্যবহার, খালি মানুষের হাঁটার ব্যবস্থা নেই। ঢাকায় যে ৭ ভাগ মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি আছে, তাদের গাড়ি রাখার জন্য পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা নেই। তারা যেখানে সেখানে গাড়ি পার্ক করে ৯৩ ভাগ মানুষের হাঁটার রাস্তাও আটকে দেয়। হাইকোর্টকে ধন্যবাদ তারা পার্কিং হিসেবে নির্ধারিত সব জায়গা খালি করার নির্দেশ দিয়েছেন। উঁচু উঁচু ভবনগুলো যখন বানানো হয়, তখন রাজউককে দেখায় তারা পর্যাপ্ত পার্কিং স্পেস রাখবে। পরে সেগুলোও কাজে লাগিয়ে দেয়। আর গাড়ি রাখে জনগণের রাস্তায়। বড় লোকদের গাড়িগুলো রাখার পর্যাপ্ত জায়গা করে দিলে সাধারণ মানুষ একটু স্বস্তি পাবে।

এই যে এত সমস্যা, এত বৈষম্য। মশা, ডেঙ্গু, রিকশা নেই, গাড়ি রাখার জায়গা নেই। তবু এই জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ, বৈষম্যের চাপে বেসামাল ঢাকাই আমাদের প্রিয়। চলুন আমরা চেষ্টা করি, ঢাকাকে কতটা নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য রাখা যায়।

এইচআর/পিআর