অর্থনীতি

পিপলস লিজিং অবসায়ন হলেও শঙ্কা নেই

পিপলস লিজিং অবসায়ন হচ্ছে তবে আমানতকারীদের আতঙ্ক হওয়ার কিছু নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় চরম সংকটে থাকা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস’র (পিএলএফএসএল) অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সিদ্ধান্তে আমানত ফিরে না পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় আমানতকারীদের মধ্যে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এক্ষেত্রে আমানতকারীদের কোনো সমস্যা হবে না। কারণ পিপলস লিজিংয়ের আমানতের চেয়ে সম্পদের পরিমাণ বেশি।

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক পিপলস লিজিংয়ের অবসায়ন নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম এবং নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলম।

তারা জানান, পিপলস লিজিংয়ের আমানতের তুলনায় সম্পদের পরিমাণ বেশি। তাদের আমানতের পরিমাণ দুই হাজার ৩৬ কোটি টাকা। বিপরীতে সম্পদ আছে তিন হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। এ কারণে আমানতকারীদের শঙ্কার কিছু নেই।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ২০১৪ সালে তদন্ত করে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য আমরা জানতে পারি। যেখানে পরিচালনা বোর্ডের অনেক সদস্যের অনিয়ম পাওয়া যায়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি দিয়ে পরিচালনা বোর্ড ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়।

‘এত কিছুর পরও প্রতিষ্ঠানটির উন্নতি করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের জন্য আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেই। গত ২৬ জুন মন্ত্রণালয় অবসায়ন করতে অনুমতি দেয়। পরে অবসায়নের জন্য আদালতে যাওয়ার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’

‘অবসায়ন হলেও আমানতকারীদের আতঙ্কের কিছু নেই’ উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, আমাদের কাছে যে হিসাব রয়েছে, এতে প্রতিষ্ঠানটির আমানতের তুলনায় সম্পদের পরিমাণ বেশি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমানে আমানত দুই হাজার ৩৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সম্পদ রয়েছে তিন হাজার ২৩৯ কোটি টাকা।

পিপলস লিজিংয়ের মতো অন্যান্য যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সংকটে রয়েছে তাদেরও অবসায়ন করা হবে কি-না- জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম জানান, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের। এজন্য যা যা করা দরকার আইন অনুযায়ী তা-ই করা হবে। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের আশ্বস্ত করতে চাই যে, তারা যেন কোনো বিপদে না পড়েন সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সজাগ রয়েছে।

আমানতকারীরা কতদিনের মধ্যে অর্থ ফেরত পাবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পাওয়ার পর থেকে আমরা কাজ শুরু করেছি। ইতোমধ্যে আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দ্রুত আমরা এ কার্যক্রম সম্পন্ন করব। তবে যেহেতু আমরা আদালতে যাচ্ছি, এটা এখন আদালতের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা আমানতকারীদের অর্থ যত দ্রুত সম্ভব দেয়ার চেষ্টা করব।

আমানতকারীদের শতভাগ অর্থ ফেরত দেয়া হবে কি-না, জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটাও সিদ্ধান্ত নেবেন আদালত।

যে কারণে পিপলস লিজিং বন্ধ

অনিয়ম, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় চরম সংকটে থাকা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (পিএলএফএসএল) কার্যক্রম বন্ধের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

পিপলস লিজিংকে অবসায়ন করা হচ্ছে এ বিষয়টি স্বীকার করলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম এ সংক্রান্ত কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে আমি শুনেছি। ঠিক আছে কিন্তু এ বিষয়ে না জেনে কোনো মন্তব্য করতে পারব না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানায়, পিপলস লিজিংয়ে ঋণ বিতরণে অব্যবস্থাপনা, সম্পত্তির ঝুঁকি ও তারল্য সংকটে দুরবস্থায় রয়েছে। তারা আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে পরছে না। সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে চিঠি দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।

চিঠিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের ২২ (৩) এবং ২৯ ধারায় প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। সম্মতি দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় গত ২৬ জুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দেয়। চিঠি পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এজন্য প্রতিষ্ঠানটিতে আটকে থাকা আমানতের পরিমাণ, অনিয়মের ধরন, প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ও মাসিক বেতন-ভাতার পরিমাণ উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে।

পিপলস লিজিংয়ের আর্থিক অবস্থা

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক তথ্য অনুযায়ী, পিপলস লিজিংয়ে আমানত রয়েছে দুই হাজার ৮৬ কোটি টাকা। তবে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার মতো নগদ অর্থ সংকটে রয়েছে। ফলে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।

১৯৯৭ সালে কার্যক্রম শুরু করা এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় মতিঝিলে। এছাড়া গুলশান ও চট্টগ্রামে দুটি শাখা রয়েছে। পিপলস লিজিংয়ে এক হাজার ১৩১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ৭৪৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এ প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সালের পর থেকে কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি।

তাদের মোট শেয়ারের ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশই রয়েছে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের হাতে। বাকি শেয়ারের মধ্যে স্পন্সর ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ২৩ দশমিক ২১ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে।

আইনে যা বলা আছে

আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের ২২ (৩) ধারা অনুযায়ী, আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই আইনের ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোম্পানি আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের ভিত্তিতে কোনো আর্থিকপ্রতিষ্ঠান অবসায়নের জন্য আদেশ দিতে পারবে।

একই আইনের ৮ ধারায় যেকোনো আর্থিকপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংককে দেয়া হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন কারণে যে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করতে পারবে। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে আমাতকারীদের স্বার্থহানি হয় এমনভাবে ব্যবসা করা, দায় পরিশোধে অপর্যাপ্ত সম্পদ, অবসায়ন বা কার্যক্রম বন্ধ, লাইসেন্স পাওয়ার জন্য মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ ইত্যাদি।

অর্থ ফেরতের বিষয়ে আইনে যা আছে

সংশ্নিষ্টরা জানান, অবসায়ন হওয়া প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীর অর্থ কোন উপায়ে ফেরত দেয়া হবে, সে বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনে কিছু বলা নেই। এক্ষেত্রে আদালত যে উপায়ে অর্থ পরিশোধ করতে বলবেন, তা কার্যকর হবে। তবে সাধারণভাবে সম্পদ বিক্রি এবং সরকারের সহায়তার আলোকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়া হয়।

এজন্য প্রথমে প্রতিষ্ঠানের দায় ও সম্পদ নিরূপণ করা হয়। এরপর একটি স্কিম ঘোষণা করা হয়। যেখানে নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ করে কোন পরিমাণ আমানত কবে নাগাদ পরিশোধ করা হবে তার উল্লেখ থাকে।

কষ্টের টাকা ফেরত না পেলে মাঠে মারা যাব

কষ্টের টাকা জমিয়ে ডিপোজিট রেখেছি, এখন যদি ফেরত না পাই তাহলে মাঠে মারা যাব। এভাবে নিজের কথাগুলো বলছিলেন পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (পিএলএফএসএল) আমানতকারী বাবলা।

বুধবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বন্ধের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই অনেক আমানতকারী পিপলস লিজিংয়ের অফিসে আসছেন। কিন্তু তথ্য জনানোর মত কোনো কর্মকর্তা অফিসে নেই।

পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারী বাবলা বলেন, আমি ১৪ লাখ টাকা আমানত রেখেছি। পিপলস লিজিং বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এমন খবর শোনার পর প্রথমে গুলশান ব্রাঞ্চে যায়। কারণ আমার ওই ব্রাঞ্চে করা। কিন্ত গত দুদিন ধরে তাদের অফিসে কোনো কর্মকর্তা নেই আজকে মতিঝিল ব্রাঞ্চে এসে দেখি একই অবস্থা। সকালে অফিসে এসেছি কথা বলার মত কেউ পায়নি। একজন অপারেশন ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা হলো উনি বলেলন, ধৈর্য ধরেন অবশ্যই টাকা পাবেন। আমার অনেক কষ্টের টাকা জমিয়ে ডিপোজিট রেখেছি, এখন যদি ফেরত না পাই তাহলে মাঠে মারা যাব।

এদিকে শামীম রেজা নামের পিপলস লিজিংয়ের এক কর্মকর্তা জানান, আমি মাঠ লেভেলে কাজ করি। কথা বলার মত কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। তবে বড় আতঙ্কে আছি আমরাও। কারণ আমাদেরই এখন চাকরি থাকবে না।

কোম্পানির অবসায়নের বিষয়টা পত্রপত্রিকায়় প্রকাশ হওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ অফিসে আসছে না। কী বলব বলেন-যোগ করেন তিনি।

এদিকে আরেক আমানতকারী মো. হানিফ জানান, বেশি সুদ দেয়ায় ২০১৭ সালে ৮৪ লাখ টাকা আমানত ছিল। অনেক দিন টাকা তোলা যাচ্ছে না। সবশেষ ঈদের আগে ১০ লাখ টাকা উঠিয়েছিলাম। কিন্তু তারপর থেকে অনেকবার চেষ্টা করেও বাকি টাকা আর ফিরে পাইনি। এখন বন্ধ হয়ে গেলে টাকা ফেরত পাব কি-না, আতঙ্কে আছি।

এসআই/এমএআর/পিআর/জেআইএম