দেশজুড়ে

ঘুষের নাম বড় বাবু, স্কুল প্রতি ১০ হাজার টাকা

বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যের জন্য পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা শিক্ষা অফিসার মর্জিনা খাতুনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ অবস্থায় মঙ্গলবার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার খন্দকার মনসুর রহমান উপজেলা শিক্ষা অফিসার মর্জিনা খাতুনকে তিনদিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন।

নোটিশে তার বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না এ মর্মে বৃহস্পতিবারের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। নোটিশের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার খন্দকার মনসুর রহমান।

শিক্ষা অফিসার খন্দকার মনসুর রহমান বলেন, মর্জিনা খাতুনের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ। ঘুষ ও অনিয়মের জন্য তার শাস্তির সুপারিশ করে মহাপরিচালকের অফিসে ৬ আগস্ট চিঠি পাঠানো হয়। মঙ্গলবার তাকে কারণ দর্শানোর চিঠি দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না এ মর্মে বৃহস্পতিবারের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।

উপজেলা ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, সাঁথিয়া উপজেলা শিক্ষা অফিসার মর্জিনা খাতুনের অনিয়ম এবং ঘুষ-দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার অফিসে বসে উচ্চমান সহকারী গোলজার হোসেনের ঘুষ নেয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার আগেই শিক্ষকদের অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা শিক্ষা অফিসার মর্জিনা খাতুনের বিরুদ্ধে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে তদন্ত করা হয়। এতে তার অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া যায়। ৬ আগস্ট তার শাস্তির সুপারিশ করে মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘুষ না দেয়ায় সাঁথিয়া উপজেলার ১৭৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্লিপ প্রোগামের টাকা ছাড় দেননি শিক্ষা অফিসার মর্জিনা খাতুন। গত ৩০ জুনের মধ্যে এসব টাকা ছাড়ের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তিনি সরকারি বিধি লঙ্ঘন করেছেন। ১৭৫টি বিদ্যালয়ের বিপরীতে বরাদ্দকৃত স্লিপসহ ক্ষুদ্র মেরামতের টাকা অবৈধভাবে নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়েছেন তিনি। এখন বিদ্যালয় প্রতি ছয় থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে বরাদ্দ ছাড়ছেন মর্জিনা খাতুন।

যেসব বিদ্যালয় ঘুষ দিতে অস্বীকার করছে তাদের টাকা আটকে রেখেছেন তিনি। শিক্ষা অফিসারের নির্দেশে অফিসের ‘বড় বাবু’ নামে পরিচিত উচ্চমান সহকারী গোলজার হোসেন ঘুষের এসব টাকা নিচ্ছেন। এরই মধ্যে প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

এরপর উপজেলা শিক্ষা অফিসার মর্জিনা খাতুন ও উচ্চমান সহকারী গোলজার হোসেনের শাস্তির দাবি ওঠে। প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণের ভিডিও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের চোখে পড়লে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এরপরই উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং উচ্চমান সহকারী গোলজার হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

সাঁথিয়া উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্র, ভুক্তভোগী কয়েকজন শিক্ষক ও বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা জানিয়েছেন, বিদ্যালয় প্রতি স্লিপ বরাদ্দ এসেছে বিদ্যালয়ের ক্যাটাগরি অনুযায়ী ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত। রুটিন মেইনটেন্যান্স বাবদ অধিকাংশ বিদ্যালয় পেয়েছে ৪০ হাজার টাকা। বড় মেরামত বাবদ অনেক বিদ্যালয়ে বরাদ্দ এসেছে দু’লাখ টাকা। এসব টাকা ৩০ জুন ২০১৯ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের হিসাব নম্বরে পাঠানোর কথা ছিল।

স্লিপের টাকা উপজেলা শিক্ষা অফিসারের অ্যাকাউন্টে আসার তিনদিনের মধ্যে সব বিদ্যালয়ের হিসাব নম্বরে স্থানান্তরের সরকারি নির্দেশ রয়েছে। বিদ্যালয়ের হিসাব নম্বর পরিচালিত হয় প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির যৌথ স্বাক্ষরে। কিন্তু সাঁথিয়া উপজেলা শিক্ষা অফিসার মর্জিনা খাতুন সরকারি কোনো নিয়ম মানেননি। ৩০ জুনের মধ্যে একটি বিদ্যালয়ের টাকাও ছাড় করেননি। ওসব টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে রেখেছেন তিনি। টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে নেয়ার পর উচ্চমান সহকারী গোলজার হোসেনের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকদের খবর দিয়েছেন টাকা তুলে নেয়ার জন্য।

তবে এক্ষেত্রে উপজেলা শিক্ষা অফিসার শর্ত দেন, স্লিপের টাকার চেকের জন্য বিদ্যালয় প্রতি ছয় হাজার, রুটিন মেইনটেন্যান্স চেক প্রাপ্তির জন্য বিদ্যালয় প্রতি ছয় হাজার, ওয়াশ ব্লক মেরামত কাজের জন্য ২-৩ হাজার টাকা দিতে হবে। পাশাপাশি মেরামত কাজের জন্য বিদ্যালয় প্রতি ১০ হাজার টাকা দিতে হবে। এটা উপজেলা শিক্ষা অফিসারের অংশ। অফিস সহকারী গোলজারকে প্রত্যেক খাতে ঘুষ দিতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দেন শিক্ষা অফিসার মর্জিনা।

উপজেলার বামনডাঙ্গা বিদ্যালয়ের সভাপতি মাসুদ রানা বলেন, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা আলেয়া খাতুন আমাকে বলেন মেরামত বাবদ বরাদ্দ দেয়া টাকা তুলতে হলে উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে ছয় হাজার টাকা ঘুষ দিতে হবে। কেরানিকে আরও দুই হাজার টাকা দিতে হবে।

তিনি বলেন, আমি প্রধান শিক্ষিকাকে ঘুষ দিতে নিষেধ করি এবং বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করি। এতে উপজেলা শিক্ষা অফিসার নানা রকম টালবাহানা করে অবশেষে বরাদ্দের চেক দেন। তবে চেক দেয়ার সময় আলেয়া খাতুনকে শিক্ষা অফিসার মর্জিনা খাতুন বলেন, ‘আমি টাকা চেয়েছি গোপনে, আর আপনি সবাইকে জানিয়ে দিলেন।’

ক্ষেতুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহাদত হোসেন বলেন, আমার বিদ্যালয়ে বরাদ্দ হওয়া এক লাখ ৩০ হাজার টাকার এক টাকাও দেননি শিক্ষা অফিসার। ঘুষ না দেয়ায় টাকা দেননি শিক্ষা অফিসার।

বৃহস্পতিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নাছিমা খাতুন বলেন, ঘুষ না দেয়ায় আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন শিক্ষা অফিসার মর্জিনা খাতুন। বাধ্য হয়ে ঘুষ দিয়ে বিদ্যালয়ের বরাদ্দের টাকা এনেছি।

একই কথা বললেন সোনাতলা পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হান্নান। তিনি বলেন, শিক্ষা অফিসারকে ঘুষ না দেয়ায় ৯৭টি বিদ্যালয়ের বরাদ্দের চেক দেয়া হয়নি।

সাঁথিয়ার বিলকুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান বলেন, উপজেলা শিক্ষা অফিসার আমার কাছ থেকে স্লিপ, রুটিন মেইনটেন্যান্স এবং মেরামত বাবদ বরাদ্দ থেকে আলাদা আলাদা করে ঘুষ নিয়েছেন। বিদ্যালয়ের কাজের স্বার্থে অসহায় হয়ে টাকা দিয়েছি। আমার বিদ্যালয়ের মতো অন্য যেসব বিদ্যালয়ের টাকা ছাড় করা হয়েছে সেসব বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছেন। এখনো ৯৭টি বিদ্যালয় থেকে ঘুষের টাকা না পাওয়ায় চেক দেননি উপজেলা শিক্ষা অফিসার।

সাঁথিয়া উপজেলা শিক্ষা অফিসে কর্মরত কয়েকজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার জানান, উপজেলা শিক্ষা অফিসার মর্জিনা খাতুনের অসদাচরণে অতিষ্ঠ তারা। তিনি সব সহকারী অফিসারকে গালিগালাজ করেন। নিজের রুমে হাজিরা খাতা রেখে তালাবদ্ধ করে রেখে দেন। এতে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে পারেন না। পরে অনুপস্থিত দেখিয়ে গালিগালাজ করা হয়। তার আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা সাঁথিয়া থেকে বদলি হওয়ার কথা ভাবছেন। এরই মধ্যে একজন বদলি হয়ে চলে গেছেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা অফিসের উচ্চমান সহকারী গোলজার হোসেন বলেন, আমি সব অনিয়ম করেছি ঠিকই, তবে এসব করেছি উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশ মোতাবেক। আমার কোনো দোষ নেই।

এ বিষয়ে জানতে উপজেলা শিক্ষা অফিসার মর্জিনা খাতুনের মোবাইল নম্বরে ফোন করা হলে সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার সঙ্গে মোবাইলের সংযোগ কেটে দেন।

জানতে চাইলে পাবনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) শাহেদ পারভেজ বলেন, ওই শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উচ্চমান সহকারীর ঘুষ গ্রহণের বিষয়টি সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে শুনেছি। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানালে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর নির্দেশ দেন তিনি। আমরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।

একে জামান/এএম/এমকেএইচ