দেশজুড়ে

দুর্যোগ সহনীয় ঘর পেয়ে খুশি অসহায়রা

নওগাঁ সদর উপজেলার হাঁপানিয়া ইউনিয়নের উল্লাশপুর গ্রামের দরিদ্র বিধবা গৃহবধু ফিরোজা বেগম। গত ২৫ বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন। তারপর দুই মেয়েকে নিয়ে কুঁড়েঘরে বসবাস শুরু করেন। মেয়েদের বড় করে প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় এক মেয়ে বিধবা এবং অপরজনের ডিভোর্স হয়। এরপর আবারও শুরু হয় বেঁচে থাকার যুদ্ধ।

দুই মেয়ে ও তিন নাতী-নাতনীকে নিয়ে স্বামীর রেখে যাওয়া সামান্য জমিতে টিনের দুটো কুঁড়ে ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস শুরু করেতে থাকেন ফিরোজা বেগম। টিনগুলো অনেকদিনের হওয়ায় অসংখ্য ছিদ্র হয়ে যায়। ফলে বর্ষায় পানি এবং শীতে হিমেল হওয়া ঢুকতো। জীবিকার তাগিদে তারা বেছে নেন চাতাল শ্রমিকসহ কৃষি কাজ।

এখন ফিরোজা বেগমের দুর্ভোগ কিছুটা কমেছে। দুই মাস আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে টিআর-কাবিটা কর্মসূচির আওতায় দুর্যোগ সহনীয় বাড়ি পেয়েছেন তিনি। এখন সেখানে তারা নিশ্চিন্তে বসবাস করছেন ।

শুধু ফিরোজা বেগমই নয়, তার মতো জেলার ১১টি উপজেলায় অসচ্ছল, হত দরিদ্র, গৃহহীন পরিবার, বিধবা, প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষ, অসচ্ছলরা আধা পাকা বাড়ি পেয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে।

২০১৮-১৯ অর্থ বছরে জেলার ২১১টি পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় দুর্যোগ সহনীয় বাড়ি দিয়েছে সরকার। এমন বাড়ি পেয়ে খুশি তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন অসহায়সহ এলাকাবাসী। তবে চাহিদার তুলনায় বাড়ি অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন তারা।

জেলা ত্রাণ ও পূর্নবাসন কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, ৪০০ বর্গফুটের ওপর বাড়িগুলো পাঁচ ইঞ্চি ইটের গাঁথুনি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ২ কক্ষের প্রতিটির দৈর্ঘ্য ১০ ফুট ও প্রস্থ ১০ ফুট। প্রতিটি ঘরে দুটি করে লোহার বা কাঠের দরজা-জানালা, অত্যাধুনিক রঙিন টিনের ছাউনি, বারান্দা, একটি রান্নাঘর, রান্না ঘরে যাওয়ার করিডোর ও স্বাস্থ্য সম্মত স্যানিটারি ল্যাট্রিন রয়েছে।

এসব বাড়ি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, বজ্রপাত প্রতিরোধে সক্ষম। ২১১টি পরিবারের প্রতিটি বাড়ি নির্মাণে ২ লাখ ৫৮ হাজার টাকা হিসেবে মোট ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৪৫ লাখ ৫০ হাজার ৪১ টাকা।

জানা গেছে, ৪০০ বর্গফুটের উপর একটি বাড়ি হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে প্রায় সাড়ে ৮শ বর্গফুট জমির প্রয়োজন হচ্ছে। বাড়ির বারান্দা থেকে রান্নাঘর ও স্যানিটারি ল্যাট্রিন পর্যন্ত দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৭ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ২৩ ফুট। বাড়ির মোট আয়তন দাঁড়ায় ৮৫১ বর্গফুট (প্রায় দুই শতাংশ)। অনেক দরিদ্র পরিবার আছে যাদের বাড়ির ধরন বা আকৃতি অনুযায়ী ঘর তৈরি করা কষ্টকর। এজন্য বাড়ি দুই বা তিন ধরনের হওয়া প্রয়োজন।

উল্লাশপুর গ্রামের দরিদ্র বিধবা ফিরোজা বেগম বলেন, অনেক কষ্ট করে দুই মেয়েকে মানুষ করেছি। এখনও কষ্ট করেই যাচ্ছি। ভাঙা টিনের ঘরে বসবাস করতাম। এখন সরকার থেকে একটি ঘর দিয়েছে সেখানে বসবসা করছি। ইটের ঘর পাব তা স্বপ্নেও ভাবিনি। এখন শান্তিমতো ঘুমাতে পারছি। দোয়া করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুস্থভাবে আরও অনেকদিন বেঁচে থাকেন। আর গরিব মানুষের দিকে মুখ তুলে তাকান।

সদর উপজেলার মুক্তারপাড়ার (আকন্দ পাড়া) বিধবা রেখা বেগম বলেন, ৬ বছর আগে ছেলে নিরবকে (২) রেখে স্বামী ক্যান্সারে মারা গেছে। নানার দেয়া সামান্য জমিতে বেড়ার বাড়ি ছিল। নিজের বলতে ওই বেড়ার বাড়েই একমাত্র সম্পদ। মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবন যাপন করি। প্রতিবেশীদের সহায়তায় ছেলেকে পড়াশুনা করাচ্ছি। সরকার থেকে ৩ মাস হলো ইটের ঘর পেয়েছি। এই ঘর পেয়ে আমি খুবই খুশি।

বদলগাছীর নিহনপুর গ্রামের বেলাল হোসেনের স্ত্রী বলেন, আমার স্বামী অসুস্থ। কোনো কাজ করতে পারে না। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। মানুষের দয়া আর দানের উপর কোনোমতে বেঁচে আছি। মেয়ে-জামাইরা বেড়াতে আসলে দিনে এসে রাতে চলে যায়। কারণ ভাঙা মাটির বাড়িতে ঘুমানোর পরিবেশ নেই। চেয়ারম্যান-মেম্বারের সহযোগিতায় ঘর পেয়ে অনেক খুশি। এখন মেয়ে-জামাইরা বেড়াতে আসলে একটা রাত শান্তিতে ঘুমাতে পারবে।

নওগাঁ সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটা বিশেষ উদ্যোগ। দেশের কোনো মানুষ যেন বাস্তুহারা না থাকে সেই লক্ষ্যে কাজ করছেন তিনি (প্রধানমন্ত্রী)। এর অংশীদার হতে পেরে আমরাও খুশি। স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও রান্নাঘর সুবিধাসহ এসব বাড়ি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, বজ্রপাত প্রতিরোধে সক্ষম।

তিনি আরও বলেন, সদর উপজেলায় ২০টি ঘর পেয়েছি, তবে চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘জমি আছে ঘর নাই’ প্রকল্পের আওতায় গৃহহীনদের বাড়ি দেয়া হচ্ছে যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভিনব ও চমৎকার উদ্যোগ। বাড়িগুলো পেয়ে হতদরিদ্ররা এতো খুশি হয়েছেন যে আমার সামনে তারা হাত তুলে প্রধানমন্ত্রীর জন্য দোয়া করেছেন।

তিনি বলেন, আমরা সফলভাবে বাড়িগুলো তৈরি করতে পেরেছি। এতে করে গ্রামের পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন হবে। ব্যাপক চাহিদা থাকায় এ ধরনের বাড়ি নির্মাণের ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

আব্বাস আলী/এমএমজেড/এমকেএইচ