হলি আর্টিসান মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামির মধ্যে দুজনের বাড়ি বগুড়ায়। এদের একজন রাকিবুল হাসান রিগ্যান, বাড়ি বগুড়ার ইসলামপুর পশ্চিমপাড়ায়। বাবার নাম মৃত রেজাউল হক। অপরজন মামুনুর রশিদ রিপন ওরফে রেজাউল করিম। বাড়ি নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের শেখের মাড়িয়া গ্রামে। বাবার নাম মৃত নাসির উদ্দিন।
এদিকে আজ (২৭ নভেম্বর) আলোচিত এ মামলার রায় শোনার পর জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রাকিবুল হাসান রিগ্যানের মা রোকেয়া বেগম (৪২)। এ সময় স্বজনদের চিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বুধবার দুপুরে রায় ঘোষণার পরপরই সরেজমিনে রিগ্যানের বাড়ি গেলে এই চিত্র দেখা যায়। এ সময় তার মা রোকেয়া বেগম চিৎকার করে বলতে থাকেন রিগ্যান নির্দোষ, তাকে ফাঁসানো হয়েছে।
বোনজামাই আবু হোসেন জানান, রিগ্যান বগুড়া করতোয়া মাল্টিমিডিয়া স্কুল থেকে এসএসসি পাস করার পর শাহ সুলতান কলেজে ভর্তি হয়। কলেজে অধ্যায়নরত অবস্থায় তাবলিগে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে সবার অজান্তে রিগ্যানকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায় বাড়ির ভাড়াটিয়ার ছেলে সিহাব নামে এক সহপাঠী। এরপর থানা পুলিশ, র্যাব অফিস, ডিবি অফিসসহ সংশ্লিষ্ট সব দফতরে নিখোঁজের জিডি করেন। সম্ভাব্য সব স্থানে রিগ্যানকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও বহু কষ্টে সিহাবের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে দুপচাঁচিয়া তার বোনজামাইয়ের বাড়ি থেকে সিহাবকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সেই সিহাব জামিনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ নিরপরাধ রিগ্যানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো। রিগ্যানকে গ্রেফতারের পর পুলিশ ডান পায়ে গুলি করেও স্বীকারোক্তি আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে। আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে রিগ্যান বলেছে, সে নির্দোষ। জঙ্গি আস্তানায় তাকে জোর করে আটকে রাখা হয়েছিল। তাকে বের হতে দেয়া হয়নি। মেরে ফেলারও হুমকি দিয়েছে। রিগ্যান নির্দোষ, এই রায় মানি না।
বোন তানিয়া সুলতানা জানান, তারা দুই ভাইবোন। ছোট ভাই রিগ্যান গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে মা রোকেয়া বেগম খাওয়া-দাওয়া ছেড়েছেন। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শরীর ভেঙে পড়েছে। অসুস্থতার কারণে মাকে তার বাড়ি রেখেছেন। মা সবসময় কান্নাকাটি করেন। ‘নির্দোষ’ ছেলেকে রক্ষা করতে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছেন। কোরআন তেলাওয়াত করছেন। নিরপরাধ ছেলের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শোনার পর থেকে থেমে থেকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। ছেলের শোকে না জানি তাকে হারাতে হয়।
রিপনের গ্রামের বাড়ি
রিপনের বাড়িতে উৎসুক জনতা
নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের শেখের মাড়িয়া গ্রামে মামুনুর রশিদ রিপনের বাড়ি গিয়ে দেখা গেছে উৎসুক গ্রামবাসী রায় শোনার জন্য টেলিভিশনের সামনে আগ্রহ সহকারে বসে আছেন। রায় ঘোষণার পর রিপনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বড় ভাইয়ের স্ত্রী সাহেরা বেগম ছাড়া কেউ নেই। মা হাসনা হেনা ও বড় ভাই মাসুদ সরদার মঙ্গলবার ঢাকায় গেছেন রায় শোনার জন্য। ভাবি সাহেরা বেগম রায় নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
টেলিভিশনের সামনে বসে রায় শুনতে আসা একই গ্রামের শাহ জামাল ও আব্দুস ছাত্তার বলেন, রিপনকে ছোট বেলায় শান্তশিষ্ট দেখেছেন। গ্রামের ছেলে হিসেবে রায় শোনার আগ্রহ থেকে মাঠের কাজ ফেলে টেলিভিশনের সামনে বসেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর গুলশানের হলিআর্টিসানে হামলার অর্থ জোগানদাতা হিসেবে মামুনুর রশিদ রিপন ওরফে রেজাউল করিম ওরফে রেজাকে গত ১৯ জানুয়ারি রাতে গাজীপুর বোর্ডবাজার এলাকার একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করে র্যাব। সে শেখের মাড়িয়া গ্রামের মৃত নাসির উদ্দিনের ছোট ছেলে। গ্রামের লোকজন মামুন সরদার নামেই চেনে। স্থানীয় আঁচলতা মাদরাসা থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ২০০৯ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নবাবগঞ্জ দারুস হাদিস মাদরাসা থেকে দাওরা পাস করে। এরপর বগুড়ার সাইবার টেক নামে একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে অফিস অ্যাপ্লিকেশন কোর্স করে ওই প্রতিষ্ঠানেই চাকরি নেন।
ভাবি সাহেরা বেগম বলেন, ছোট থেকেই মামুন বাইরে থাকতো। নয় বছর আগে মামুনের বাবা মারা যায়। লেখাপড়া শেষ করে বগুড়ায় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চাকরি নিয়েছে বলে বাড়িতে জানিয়েছিল। এরপর জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গোবরগাড়ী বিয়ে করে। তারপর থেকে বাড়িতে বেশি আসতো না। ২০১৫ সাল থেকে রিপন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এর মধ্যে একদিন ফোন করে বাড়ির সবার খবর নেয় এবং সে ভালো আছে বলে ফোন কেটে দেয়। এরপর তার আর কোনো সন্ধান পাইনি।
শীর্ষ জঙ্গি সিদ্দিকুর রহমান বাংলাভাইয়ের অন্যতম সহযোগী মামা আব্দুল আউয়ালের হাত ধরেই জেএমবিতে যোগ দেয় ভাগনে রিপন। বাংলাভাইয়ের সঙ্গে আব্দুল আউয়ালেরও ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।
হলি আর্টিসান মামলার রায়ের সব খবর পড়ুন এক ক্লিকে
লিমন বাসার/এমএমজেড/পিআর