দেশজুড়ে

তিস্তা-ধরলার পাড়ে ভিটেহারা মানুষের কান্নার রোল

‘নদীতে ঘরবাড়ি ভেঙে যাইতেছে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। ঘরের সবকিছু নিয়ে এসে নদীর পাড়ে রাখছি। জায়গা জমি কিচ্ছু নেই, কোথায় যাব?’ এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন তিস্তায় ভিটে হারানো আনোয়ারা বেগম (৩৫)। ছেলে-মেয়েসহ ৫ জনের অভাবের সংসার। সহায় সম্বল হারিয়ে এখন নিঃস্ব তিনি।

সুখের সংসার ছিল দিনমজুর আব্দুল হামিদ ও আনোয়ারা বেগম দম্পতির। এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তিস্তা পাড়ে সুখের সংসার শুরু করেন। দশ দিন আগেও সংসার চলছিল নিজ ঘরেই। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস বর্তমানে সেই ঘরবাড়ি এখন তিস্তার পেটে। পরিবার নিয়ে এখন ঠাঁই নিয়েছেন নৌকায়।

তিস্তার ভয়াভহ ভাঙনে হাতীবান্ধার ৬টি ইউনিয়নে গত ১০ দিনে প্রায় এক হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। তিস্তা ও ধরলা নদীর পাড়ে এখন ভিটেহারা মানুষের কান্নার রোল।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, তিস্তায় ঘরবাড়ি বিলীন হওয়ার আগেই নৌকায় করে ঘরের আসবাবপত্র নিয়ে তীরে আশ্রয় নিচ্ছে মানুষ। কেউ আবার রাস্তার পাশে নতুন করে ঘর তৈরির চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ অবাক দৃষ্টিতে তিস্তার ভাঙন দেখছেন। ভাঙন কবলিতদের চোখের জল মিশে যাচ্ছে তিস্তায়।

এবার বর্ষার শুরু থেকেই ভয়াল রূপ ধারণ করেছে তিস্তা। এতে লালমনিরহাটের ৫ উপজেলায় বিলীন হয়েছে ফসলি জমি, বাজার, ঘরবাড়ি, মাছের ঘেরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। প্রতিবছর এভাবে প্রায় কয়েক হাজার হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়। ঘরবাড়ি, ফসলের জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায় অসংখ্য মানুষ।

তিস্তার পাড়ে ঠাঁই নেয়া আব্দুল হামিদ বলেন, এতদিন অন্যের জমিতে বাড়ি করে ছিলাম। আজ সেই ভিটেও ভেঙে গেল।

তিস্তা ও ধরলার ভাঙনে এমন করুন অবস্থা শুধু আব্দুল হামিদের নয়। তার মতো অনেকের। কিছুদিন আগেও এসব পরিবার নিজ ঘরে বসে খাবার খেতেন কিন্তু এখন কেউ অন্যের জমিতে আবার কেউ রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছেন।

এদিকে ভারত থেকে আসা ঢলে তিস্তা নদীর পানি হঠাৎ ফুলে-ফেঁপে উঠে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ভাসিয়ে দিয়েছে। ইউনিয়নের সর্দারপাড়ার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও সেতু বিধ্বস্ত হয়েছে। পানির তোড়ে বিদ্যুতের খুঁটি পর্যন্ত উপড়ে গেছে। বালুতে ঢেকে গেছে বিস্তীর্ণ রোপা আমনের ক্ষেত। সর্দারপাড়ার পাশাপাশি দগ্রহামের তিস্তা তীরবর্তী কাতিপাড়া, সৈয়দপাড়া ও মুন্সীপাড়া এলাকাতেও একইভাবে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এলাকাবাসী বলছেন, রিলিফ চাই না। তিস্তার ভাঙন রোধে বাম তীরে বাঁধ চাই। সব নেতারা কথা দেয় কাজ করে না। বাঁধের জন্য আর কত কাল অপেক্ষা করব? অপেক্ষা করতে করতে বাপ দাদার ভিটে নদীর গর্ভে বিলীন হলো। প্রতিবছর বন্যা আর ভাঙনে সরকারি রিলিফ আসে কিন্তু রিলিফ আর কত খাই। আমাদের বাপ দাদার ভিটে রক্ষায় একটি বাঁধ চাই।

পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, আমি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। তিস্তার বাম তীরে একটি বাঁধ দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর জানিয়েছেন, তিস্তা ও ধরলা নদীতে ঘরবাড়ি বিলীন হওয়া পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করে তাদের পুনর্বাসন করা হবে।

রবিউল হাসান/এফএ/জেআইএম