দেশজুড়ে

ফরিদপুরে মধুমতির তীব্র ভাঙনে দিশেহারা মানুষ

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার চারটি ইউনিয়নে মধুমতি নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই ভাঙছে নদীর পাড়। এতে পাকা রাস্তা, বাড়িঘর, গাছপালা ভেঙে নদীতে বিলীন হচ্ছে।

ঘরবাড়ি হারিয়ে অনেকে খোলা আকাশের নিচে অসহায়ভাবে দিন কাটাচ্ছেন। বাড়িঘর হারিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে তাদের। কোনো জনপ্রতিনিধি তাদের কোনো খোঁজ নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তরা।

স্থানীয়রা জানান, গত শুক্রবার (১৭ জুলাই) থেকে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকটি বাড়ি, গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়াও গোপালপুর থেকে চরডাঙ্গা গ্রামে যাতায়াতের পাকা সড়কটির ৬০মিটার নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

মধুমতি নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় স্রোতে ভাঙন শুরু হয়েছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া নদী ভাঙনে চরম আতঙ্কে রয়েছেন নদীর তীরের বাসিন্দারা।

উপজেলার গোপালপুর, বানা, পাচুরিয়া ও টগরবন্দ ইউনিয়নে মধুমতি নদীর ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে গোপালপুর ও টগরবন্দ ইউনিয়নে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।

এদিকে ভাঙন ঠেকাতে অনেক আকুতি, মানববন্ধন, স্মারকলিপি পেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হলেও কোনো কাজ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সরেজমিনে দেখা যায়, মধুমতি নদীর পানি নতুন করে বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার বাজড়া, চর আজমপুর, চরডাঙ্গা, চাপুলিয়া, চরধানাইড়, শিকিপাড়া, চাপুলিয়াসহ প্রায় ১০টি গ্রাম এখন হুমকির মুখে পড়েছে। এরই মাঝে ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষের যাওয়া-আসার একমাত্র গোপালপুর-চরডাঙ্গা মেইন পাকা সড়কটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

একই সঙ্গে নদীগর্ভে চলে গেছে গুচ্ছগ্রামের ১২৫টি বাড়ি, বাজড়া পশ্চিম পাড়া জামে মসজিদসহ নানা স্থাপনা। এখন চরম হুমকির মুখে রয়েছে বাজড়া চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি গ্রামের বসতবাড়ি ও নানা স্থাপনা। ভাঙন ঝুঁকিতে গত এক সপ্তাহে উপজেলার চর আজমপুর গ্রামের প্রায় অর্ধশত পরিবার তাদের বসতঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে।

ভাঙন ঝুঁকিতে থাকা একাধিক ব্যক্তি জানান, রাস্তা রক্ষায় ও নদীর ভাঙন রোধে কাজ হচ্ছে খুব ধীরগতিতে। ফলে প্রতিনিয়ত ভাঙছে নদীর পাড়। এতে হুমকির মুখে রয়েছে স্কুল, মসজিদ, দোকানপাটসহ অসংখ্য বাড়িঘর। বসতঘর নদীতে বিলীন হলে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকবে না।

বাজড়া গ্রামের ইউপি সদস্য ওবায়দুর রহমান বলেন, নদী আমার বাড়ি থেকে অল্প কয়েক গজ দূরে। এ বছর বাড়ি মনে হয় আর থাকবে না। আমাদের এলাকায় গত কয়েকদিনে নদীর পাড়ে থাকা ১৪-১৫টি পরিবার তাদের বাড়িঘর ভেঙে অন্যত্র চলে গেছে। অনেকেই যাওয়ার জন্য বাড়ি ঘর ভাঙতে শুরু করেছেন।

টগরবন্ধ ইউনিয়নের চর আজমপুর গ্রামের বাসিন্দা রফিক বলেন, ভাঙন ঠেকাতে এলাকাবাসী কয়েকবার মানববন্ধন করেছে। সময় মতো যদি পানি উন্নয়ন বোর্ড পদক্ষেপ নিতো তাহলে রাস্তাঘাট-ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হতো না।

এলাকাবাসী আক্ষেপ করে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুর বস্তা (জিও ব্যাগ) ফেলছে বাজড়া সীমানায়। গত বছর যেখানে বস্তা ফেলা হয়েছে এবারও সেখানে বস্তা ফেলা হচ্ছে। অথচ এখন নদী ভাঙছে চর-আজমপুর, রায় পানাইল ও গোপালপুর-চরডাঙ্গা মেইন সড়ক। এক মাস হলো বস্তা ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। এ বছর চর-আজমপুর মেইন রাস্তার পাশে বস্তা ফেললে আজ এই রাস্তা ভাঙতো না।

টগরবন্ধ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমাম হাচান শিপন বলেন, আমরা বহুবার নদী ভাঙন রোধে স্থানীয় এমপি, প্রশাসন ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আবেদন করেছি। কিন্তু কোনো ফল পাইনি। ভরা বর্ষার সময় যখন ভাঙনের তাণ্ডব শুরু হয় তখন মানুষকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য শুধুমাত্র কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়। তাতে অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই হয় না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাশেদুর রহমান জানান, নদী ভাঙন ঠেকাতে বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে। খবর পেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ বলেন, মধুমতি নদীর ভাঙন রোধে প্রকল্প তৈরির কাজ চলছে। করোনার কারণে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। তবে বন্যা মৌসুমে অস্থায়ীভাবে বালুর বস্তা (জিও ব্যাগ) ফেলা হচ্ছে।

বি কে সিকদার সজল/আরএআর/পিআর