দেশজুড়ে

ঈশ্বরদীতে চামড়া বাজারে মন্দাভাব

দাম কমে যাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম পাবনার ঈশ্বরদীতে চামড়া বাজারে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার কোরবানির পশুর চামড়া এখানে পানির দরে বিক্রি হয়েছে।

গরুর চামড়া ১০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা এবং ছাগল-ভেড়ার চামড়া বিক্রি হয়েছে ৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা দরে।

মৌসুমি ব্যবসায়ীদের নিজের পুঁজি দিয়ে চামড়া কিনে তা বিক্রি করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চামড়ার এমন দরপতন ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে হচ্ছে এবং গরিবের হক লুট হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা প্রতি বছরের মতো এবারও এলাকা ভাগ করে চামড়া কিনেছেন। তারা মাপভেদে গরুর চামড়া ১০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকায় এবং ছাগলের চামড়া ৫ টাকা থেকে ৩০ টাকায় কিনেছেন। অনভিজ্ঞ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বেশি দরে কিনেছেন। ব্যবসায়িক কৌশল না বুঝে ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

অধিকাংশ কোরবানিদাতা দ্বিতীয় ক্রেতা এলাকায় না আসায় বাধ্য হয়েই কমমূল্যে চামড়া বিক্রি করেছেন। কেউ কেউ রাগ করে ব্যবসায়ীদের চামড়া না দিয়ে এতিমখানায় পৌঁছে দিয়েছেন। ২-৩ বছর আগেও গরিবের হক চামড়ার বাজার চড়া ছিল। তখন শুধু গরুর মাথার চামড়া বিক্রি হয়েছে ২০-২৫ টাকায়। গত কয়েক বছর লোকসান হওয়ায় এবার অধিকাংশ মৌসুমি ব্যবসায়ী সতর্কতার সঙ্গে চামড়া কিনেছেন ।

ঈশ্বরদী স্কুলপাড়া এলাকার বাসিন্দা শাহাদত ইসলাম মানিক নামে এক অটোরিকশা চালক জানান, তারা চার ভাগে প্রায় ৫২ হাজার টাকায় একটি গরু কোরবানি দেন। ওই গরুর চামড়া বিক্রি করেছেন মাত্র ৩০০ টাকায়।

রতন শেখ তার ৫৪ হাজার টাকা মূল্যের গরুর চামড়া একই দামে বিক্রি করেছেন। দরিনারিচা এলাকার আকাশ হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী জানান, তারা এবার ৫ ভাগে লাখ টাকা মূল্যের গরু কোরবানি দেন। কিন্তু তার গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫০০ টাকা। অথচ অন্তত ২০ জন দরিদ্র মানুষ তার কাছে মালের (চামড়া) টাকা চেয়েছেন।

একই উপজেলার ফতেমোহাম্মদপুর এলাকার আজিজার রহমান ও মজিদ মাস্টার জানান, মৌসুমী ব্যবসায়ীরা তাদের গ্রামে ৭টি গরু, ২৪টি ছাগল ও ৩টি ভেড়ার চামড়ার দাম বলেছেন তিন হাজার টাকা। তাই তিনি অধিক মূল্যের আশায় ভ্যানে চামড়াগুলো শহরে বিক্রি করতে এসেছেন। এখানে এসেও একই দাম পেয়ে হতাশ হয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুরের পর ঈশ্বরদী শহরের রেলগেট এলাকার চামড়ার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রচুর চামড়া কেনাবেচা চলছে। নিম্ন দরে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মুখে হাঁসি নেই।

বড় চামড়া ব্যবসায়ীরা গত কয়েক বছর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে এবার তারা চামড়া কিনছেন হিসেব করে।

ক্ষুদ্র (ফড়িয়া) ও মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বেশি দামে চামড়া কিনে বিপাকে পড়েছেন। মোকামে এখনও তাদের প্রায় দু’কোটি টাকার চামড়া বিক্রির অপেক্ষায় পড়ে আছে। তবে বড় ব্যবসায়ীরা এজন্য মৌসুমী ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের দায়ী করে বলছেন তারা না বুঝে বেশি দামে চামড়া কিনে সমস্যায় পড়েছেন। বড় ব্যবসায়ীদের দাবি ফড়িয়ারা বেশি দাম হাঁকায় তারাও কাংখিত দামে চামড়া না পাওয়ায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

উপজেলার দরিনারিচা এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী মন্টু মিয়া জানান, গত কয়েক বছর চামড়া ব্যবসা করে মহাজনের কাছে ২৮ লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে। তাই এবার সতর্কতার সঙ্গে চামড়া কিনেছেন। তিনি গরুর চামড়া ১০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে কিনেছেন।

ঈশ্বরদীর চামড়ার আড়ৎগুলোতে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের লাখ লাখ টাকা পাওনা বকেয়া রয়েছে। এ কারণে তারাও এবার বাকিতে চামড়া সরবরাহ করবেন না। প্রয়োজনে লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে রাখবেন। এ কারণে তারাও ছোট ব্যবসায়ীদের অধিক দামে চামড়া না কেনার পরামর্শ দেন।

ঈশ্বরদীর চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম মোল্লা জানান, অন্য বছর ঈশ্বরদী মোকামে প্রায় ১৫-২০ কোটি টাকার চামড়া কেনা-বেচা হলেও এবার তা কমে যেতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।

তিনি বলেন, এখানে চামড়া কেনা-বেচায় যে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে এর জন্য দায়ী ফড়িয়া এবং অনভিজ্ঞ মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চামড়ার দর না জেনে ও মান না বুঝে অতিরিক্ত দামে চামড়া কিনেছেন। এখন আড়তে এসে তারা নিজেরা বিপাকে পড়েছেন। ক্ষেত্র বিশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বেড়া উপজেলার নগরবাড়ির মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী রফিজ সর্দার বললেন, এবার দেড় লাখ টাকার চামড়া কিনে তাকে এক লাখ ২৫ হাজার টাকায় বেঁচতে হয়েছে। সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রামের মৌসুমী ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেন, আড়াই লাখ টাকার চামড়া কিনে তার লাভ তো দূরের কথা আসল টাকাই উঠছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বড় ব্যবসায়ী জানান, মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত দরে চামড়া কিনলে সমস্যা হতো না। তারা বাজার দর হিসেব না করে গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রতিযোগিতা করে বেশি দরে চামড়া কেনায় এখন তাদের লাভ খুব কম হচ্ছে বা ক্ষতিও হচ্ছে।

এদিকে চামড়ার দাম কম হওয়ায় কোরবানিদাতারা হতাশ হন। তারা মন্তব্য করেন, মাত্র কয়েক বছর আগে একটি গরুর চামড়া দুই হাজার থেকে আড়াই হাজারে এবং ছাগলের চামড়া ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

পশুর মূল্য অনেক বেড়ে গেলেও চামড়ার দাম নেই বললেই চলে। এতে বিভিন্ন মাদরাসার এতিম শিশুদের হক নষ্ট করা হয়েছে। তারা এ জন্য চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে দায়ী করেছেন। তারা বলছেন, গরিবের হক নষ্ট করে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছেন

চামড়া ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম মোল্লা বড় ব্যবসায়ীদের সমস্যা বর্ণনা করে জানান, মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বেশি দাম হাকায় তারাও চামড়া কেনা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

তিনি জানান, গত বছর চামড়া ব্যবসায়ীরা বড় অংকের টাকা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন আবার বকেয়া টাকা না পাওয়ায় তাদের অনেকের পুঁজিও আটকা পড়েছে। ফলে বড় ব্যবসায়ীরা এবার ভেবে চিন্তে চামড়া কিনছেন।

এমএএস/এমএস