মতামত

বেওয়ারিশ কুকুর-বিড়াল

সম্প্রতি আমার এক বিদেশি বন্ধু একটি ভিডিও ক্লিপ পাঠিয়েছে। আমার ফেসবুক পেজে আমি তা শেয়ারও করেছি দু’দিন আগে। সেখানে দেখা যাচ্ছে কোনও এক শৌখিন আরব তার বৈঠকখানায় বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে আছে এক চিতা বাঘ। চিতা সবার কাছে ঘুরছে, আদর বিনিময় হচ্ছে। কেউ তেমন ভয় পাচ্ছে না। হোস্টের সঙ্গে চিতা খুবই অন্তরঙ্গ; তবে অতিথিদের একজন রীতিমতো ভয়ার্ত এবং চিতাও তার পিছু ছাড়ছে না।

Advertisement

যে লোক চিতাকে ভয় পাচ্ছে- সে চিতাকে একটি বন্যপ্রাণী হিসেবে দেখছে। হোস্ট চিতাকে দেখছে পোষা প্রাণী হিসেবে। মানে হোস্টের কাছে চিতা একটা ‘pet’ আর গেস্টের কাছে সেটা ‘wild animal’। বেওয়ারিশ যেসব প্রাণী রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, বিশেষ করে কুকুর-বিড়াল- তাদের ওয়াইল্ড অ্যানিমেল বলা যায় না। তাদের বলা হয় ‘স্ট্রে অ্যানিমেল’। উন্নত দেশে এসব প্রাণীকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে মালিককে ফেরত দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ হেফাজতে রাখা হয়। মালিক না পাওয়া গেলে যে কেউ লালনের জন্য নিতে পারেন।

এরকম সিস্টেম আমাদের দেশে নেই। আমাদের দেশে আদিকাল থেকে রাস্তায় বেওয়ারিশ কুকুর-বিড়াল বিরাজমান। উন্নত দেশে এ ধরনের কোনো ‘স্ট্রে অ্যানিমেল’ দ্বারা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ মামলা করতে পারে। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে সরকার রাস্তায় বেওয়ারিশ প্রাণী রাখে না। এখানে পশু প্রীতির চেয়ে জনস্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবার পশু প্রীতিতে যারা বাসায় প্রাণী পোষেন সেসব প্রাণী যদি প্রতিবেশীর বিড়ম্বনার বা জনস্বাস্থ্যের হুমকির কারণ হয়- পোষাও সম্ভব নয়। বিদেশে পোষা প্রাণীর মালিকের বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলাও কম না ।

মনে আছে, এ বছরের শুরুতে খরা আর দাবানলের কবলে পড়া অস্ট্রেলিয়া উট নিধন শুরু করেছিল? দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রত্যন্ত অঞ্চলে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে উট মেরে ফেলার কার্যক্রমে ওই অঞ্চলের ১০ হাজারেরও বেশি উট মেরে ফেলে তারা। শুধু উট নয়, সম্ভবত বংশবৃদ্ধি বেড়ে যাওয়ায় তারা ক্যাঙ্গারুও নিধন করেছে। সব কিছু করেছে মানুষের স্বার্থে। সেখানে পশু নিয়ে মানুষের আবেগ জয়ী হয়নি।

Advertisement

সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বেওয়ারিশ কুকুর নিধন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল সমালোচনা হচ্ছে। সিনেমার একজন নায়িকা নাকি রিটও করেছেন এর বিরুদ্ধে। রেজাল্ট কী জানি না। কুকুর নিধন নিয়ে আমার সোশ্যাল মিডিয়ার বন্ধুরা রীতিমতো দু’ভাগে বিভক্ত। আমি ব্যক্তিগতভাবে কুকুর পছন্দ করা লোক। কুকুরকে আমার পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং মানুষের উপকারী প্রাণী মনে হয়। এর একটা বাল্যকালীন প্রভাবও থাকতে পারে।

ছোট বেলায় আমাদের ঘরে কুকুর পোষা হতো। রাতের বেলায় শিকল খুলে দেওয়া হতো। একটা কুকুরের নাম ছিল ‘বাঘা’। তাকে কারা যেন রাতে বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলেছিল। বাঘার জন্য আমাদের খুব মন খারাপ হয়েছিল। কুকুর মরে গেলে নতুন যেটি রিপ্লেস হতো সে পুরাতন নামই পেত। সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করার পর সিনিয়র বুশ ইরাক আক্রমণ করলে আমাদের তখনকার কুকুরের নাম কীভাবে যেন ‘বুশ’ হয়ে যায়। এরপর যতগুলো ছিল সবটার নাম বুশ ছিল। আমাদের একটা পোষা হরিণও ছিল। বিউটি নামের হরিণটি একবার নিজের গলার দড়ি দাঁত দিয়ে কেটে পাশের গ্রামে সবজি খেতে গেলে কুকুর দ্বারা আক্রান্ত হয়। এ রকম অভিযান সে প্রায় সফলতার সঙ্গে করে ঘরে ফিরে আসত। কিন্তু সর্বশেষ অভিযানে তার প্রাণ যাওয়ার অবস্থা হলে আমার আব্বা কাঁদতে কাঁদতে তাকে জবাই করে দেন। আমরা মাংস খেলেও বিউটির শোকে আব্বা সে মাংস খাননি।

আমাদের পোষা কুকুর থাকা সত্ত্বেও বাড়িতে অনেক বেওয়ারিশ কুকুর ছিল। সেগুলো সব সময় সমাদর পেত না, তবে তাড়ানো হতো না। একবার শীতের সকালে বাড়ির উঠানে আব্বার জন্য ভাত রাখা হয়েছিল। উনি বাইরে যাবেন, গোসল করে এসে রোদে বসে খাবেন। আসতে আসতে দেখেন এক বেওয়ারিশ কুকুর তার জন্য রাখা খাবারে মুখ দিয়েছে। আব্বা এতো রাগান্বিত হয়েছিলেন যে সোজা ঘরে ঢুকে তার লাইসেন্স করা বন্দুক এনে এক গুলিতে কুকুরটিকে হত্যা করেন। চুরি করার সাজা। চোখের সামনে কুকুর হত্যা দেখা ওটাই ছিল প্রথম।

আমার হালকা খারাপ লেগেছিল। সাজাটা একটু বেশি হয়ে গেছে মনে হয়। কিন্তু আব্বা সমাজের বিচার-আচার করা লোক, তার রায়ের বিরুদ্ধে কে কথা বলবে! বাড়ির বেওয়ারিশ কুকুরগুলো কখনও চুরি করতো না। এটা কেন করলো বুঝলাম না। তবে চুরি করতো বিড়ালগুলো। বিড়াল আমাদের বাসায় সমাদর পেতো না দুটো কারণে। প্রথমত তাকে যতই যত্ন করে খাবার দেওয়া হোক, পাতিল থেকে চুরি করে খেত। আর বিড়ালের লোম খাবারে পড়লে অসুখ হয়- এই ভীতি থেকে বিড়াল আমাদের ঘরে সমাদৃত না। কখন কোন খাবারে মুখ দিচ্ছে সেটা কত খেয়াল রাখা যায়!

Advertisement

চলতি মাসের শুরুতে আমি চট্টগ্রামে আমাদের গ্রামের বাড়ি গিয়ে দেখলাম বিড়ালের ভয়াবহ কাণ্ড। বিড়াল এখন চুরি করে খাবার খায় না, মুরগির বাচ্চা ধরে ধরে খেয়ে ফেলে। আমার ভাই বললেন, তার মুরগির ৪৫টি বাচ্চা খেয়ে ফেলেছে বিড়াল এবং তার পাশে আরেক ভাইয়ের ঘরকে বাড়ির সব বিড়াল আস্তানা বানিয়েছে। কারণ ওই ঘর তালা মারা, সে ঘরের লোকজন থাকে শহরে। শুধু ভাইয়ের না পুরো বাড়ির হাঁস-মুরগি খেয়ে ৫-৭টি বড় বড় বিড়াল তাদের অভয় আস্তানায় আশ্রয় নেয়। এদের বিষ প্রয়োগ করে মারাও সহজ না। কারণ মরে তালা দেওয়া ঘরে পড়ে থাকলে দুর্গন্ধে আশপাশের মানুষ ঘরে থাকতে পারবে না।

যাক, এতোসব কথা বলছি বেওয়ারিশ কুকুর-বিড়াল আর পোষা কুকুর-বিড়ালের মধ্যে যে তুলনা চলে না তা বোঝানোর জন্য। মানুষের আবেগ এক্ষেত্রে ভিন্ন হয়। ভিন্ন না হলে সমস্যা। যতই আবেগ দেখান- আপনার পোষা কুকুর-বিড়ালকে আর রাস্তার কুকুর-বিড়ালকে আপনি এক চোখে দেখেন না। দেখলে রাস্তায় বেওয়ারিশ প্রাণী একটাও থাকতো না। যারা ভুক্তভোগী তারাই শুধু জানে এসব বেওয়ারিশ প্রাণীর যন্ত্রণা। এই শহর সবার শহর- সেই চিন্তা করে আজ ঢাকা শহর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। গ্রামে অর্থ সংকটে পড়ে লোকজন শহরবাসী হচ্ছে। বেওয়ারিশ পশুর মতো রাস্তায় দিনযাপন করছে। পৃথিবীর অনেকে দেশেই এ সমস্যা আছে। কিন্তু সব কিছুর একটা ব্যালেন্স দরকার। সরকার আর নগর পিতাদের দায়িত্ব সেই ব্যালেন্স রক্ষা করা।

সিটি কর্পোরেশন বেওয়ারিশ পশু নিধন করলে, আপনি এই শহর আপনার এবং পশুদের সমানভাবে বাঁচার অধিকার আছে দাবি করতে পারেন না। সাধারণ পথচারীরা আক্রান্ত হচ্ছেন বেওয়ারিশ কুকুরের মাধ্যমে। যারা গাড়িতে চড়েন, বিদেশি কুকুর পালেন তারা এটা কম বোঝার কথা। ব্যক্তিগতভাবে আমি রাস্তার কুকুরকে কখনো ভয় পাই না বরং বড় লোকদের বাড়িতে পোষা কুকুরকে ভয় পাই। কিন্তু অনেক লোক রাস্তার কুকুরকে ভয় পায়, তাদের এসব কুকুরের জন্য ভোগান্তি পোহাতেও হয়। ভ্যাকসিন দেয়া থাকুক আর নাই থাকুক, রাস্তায় গণ্ডায় গণ্ডায় বেওয়ারিশ কুকুরকে ঘুরতে দেয়া ঠিক নয়। আমরা প্রকৃতির সৌন্দর্যর প্রশংসা করি কিন্তু সেই প্রকৃতি যদি ন্যূনতম শাসনে না থাকে তাহলে ওয়াইল্ড হয়ে যাবে। সেখানে মানুষ বাস করতে পারবে না। মানুষের বসবাসে রাষ্ট্র-সমাজ-প্রকৃতি যা কিছু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তা নির্মূল সবক্ষেত্রে সম্ভব না হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ভারসাম্য থাকতে হবে।

ঢাকা শহর কুকুরশূন্য হয়ে যাক আমি চাই না কিন্তু বেওয়ারিশ সব ধরনের প্রাণীকে নিয়ন্ত্রণ করা হোক সেটা চাই। এমনকি ঢাকার বাইরে যেসব জেলায় হনুমান, বানর, শিয়াল, বাদুর, অন্যান্য প্রাণীর উপদ্রুপ আছে- সেখানেও চাই এসব প্রাণীর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হোক।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।anisalamgir@gmail.com

এইচআর/পিআর