ঈদ মানে আনন্দ, আর সেই আনন্দের অন্যতম অংশ নতুন টাকা দিয়ে সালামি। কিন্তু এবার সেই আনন্দের সঙ্গী হয়েছে বাড়তি খরচ আর ভোগান্তি। ঈদকেন্দ্রিক এবার নতুন টাকা বাজারে ছাড়েনি বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ব্যাংক থেকে এবার মিলছে না নতুন টাকা। যদিও খোলা বাজারে মিলছে সহজেই- তবে দিতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের ‘বাট্টা’।
রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী রাশেদ আহমেদ প্রতিবছর ঈদে ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি ও আত্মীয়-স্বজনদের নতুন টাকা দিয়ে সালামি দেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে নতুন টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে পড়তে হয়েছে বিপাকে।
১৫ রমজানে ব্যাংকে গিয়ে তিনি পান মাত্র ১০ টাকার একটি ও ২০ টাকার একটি বান্ডিল। পরে পরিচিত একজনকে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের আশপাশের খোলা বাজারে পাঠান। সেখান থেকে যে তথ্য আসে, তাতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১০ টাকার নতুন নোটের বান্ডিলে (১ হাজার টাকা) অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে ৪৫০ টাকা, ২০ টাকার বান্ডিলে (২ হাজার টাকা) ৬৫০ টাকা। পুরোনো নোটের ক্ষেত্রেও প্রতি বান্ডিলে গুনতে হচ্ছে ৪০০ টাকা বেশি। আর ১০০ টাকার বান্ডিলে (১০ হাজার টাকা) অতিরিক্ত ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
রাশেদ আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ব্যাংকে গেলে নতুন টাকা পাওয়া যায় না, কিন্তু খোলা বাজারে বাড়তি টাকা দিলে চাহিদামতো পাওয়া যায়। এই অনিয়ম দেখার কি কেউ নেই?
সরেজমিনে দেখা গেছে, গুলিস্তান ও মতিঝিল এলাকায় ফুটপাতজুড়ে বসেছে নতুন টাকার অস্থায়ী দোকান। বিভিন্ন অঙ্কের বান্ডিল সাজিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। ক্রেতাদের ভিড়ও চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন টাকা কিনছেন। কেউ পুরো বান্ডিল নিচ্ছেন, আবার কেউ বান্ডিল ভেঙে প্রয়োজনমতো নোট কিনছেন- সব ক্ষেত্রেই গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা।
আরও পড়ুনএবার ‘ঈদ সালামির’ দামও চড়া, হাজারে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি রাখার অভিযোগ সাধারণরা বঞ্চিত, নিজেদের মধ্যে নতুন নোট ভাগাভাগি কর্মকর্তাদের
রামপুরার বাসিন্দা হাসান আলী এক বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করেন। সীমিত আয়ের মধ্যেও ঈদে নতুন টাকা কেনা তার জন্য এক ধরনের আনন্দ। জাগো নিউজকে হাসান আলী বলেন, গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চাদের হাতে নতুন ১০ বা ২০ টাকার নোট দিলে যে হাসি দেখি, সেটা অন্যরকম। এ বছরও এক হাজার ১০০ টাকা বাট্টা দিয়ে দুটি বান্ডিল কিনেছি।
নতুন টাকা বিক্রি করা কয়েকজন বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা যে বাড়তি টাকা নেন, সে টাকার পুরোটা তারা পান না। তাদের দাবি, ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে নতুন নোট বাইরে আসে, আর অতিরিক্ত টাকার বড় অংশ তাদের হাতেই যায়। ফুটপাতের বিক্রেতারা শুধু সামান্য লাভে বিক্রি করেন।
প্রতিবছর ঈদের আগে নতুন টাকার চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সেই অনুযায়ী ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় সুযোগ নিচ্ছে একটি চক্র।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকে সুষম বণ্টনের অভাব, তদারকির ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ অনিয়মের কারণে নতুন টাকার এই বাণিজ্য বন্ধ হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন টাকার বাণিজ্য বন্ধ করতে হলে ব্যাংকের মাধ্যমে পর্যাপ্ত নতুন নোট সরবরাহ নিশ্চিত করা, খোলা বাজারে অবৈধ বিক্রি বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ঈদের সালামি শুধু টাকা নয়, এটি আনন্দ ও ভালোবাসার প্রতীক। কিন্তু সেই আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে ‘বাট্টার’ চাপে।
এমইউ/কেএসআর