দেশজুড়ে

এক মানিকের নামে সাজা ভোগ করছেন আরেক মানিক

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর ইউনিয়নের আলম চাঁন ব্যাপারী কান্দি গ্রামের বাসিন্দা মানিক হাওলাদার (৪২)। তিনি পেশায় জেলে। একটি মাদক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে তিন মাস আটদিন যাবত কারাগারে সাজা ভোগ করছেন তিনি।

তার পরিবারের দাবি, ওই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত মো. মানিক মিয়া অন্য ব্যক্তি। নামের আংশিক মিল থাকায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে।

এদিকে, ওই মামলার রায়, গ্রেফতারি পরোয়ানা, মানিক হাওলাদারের জাতীয় পরিচয়পত্র, দণ্ডপ্রাপ্ত মানিক মিয়ার পরিবার ও গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে মানিক হাওলাদারের পরিবারে দাবির সত্যতা পাওয়া গেছে।

শরীয়তপুরের সখিপুর থানা সূত্রে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এর একটি মাদক মামলার চার বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মো. মানিক মিয়া, বাবা নজরুল হাওলাদার, গ্রাম ব্যাপারী কান্দির নামে একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর সখিপুর থানায় আসে। আর সখিপুর থানার পুলিশ গত বছর ২৮ নভেম্বর ওই থানার আলম চাঁন ব্যাপারী কান্দি গ্রামের মৃত নজরুল ইসলামের ছেলে মানিক হাওলাদারকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। তিনি বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে রয়েছেন। আর দণ্ডপ্রাপ্ত মো. মানিক মিয়া এখনো পলাতক রয়েছেন।

মামলার এজাহার, রায় ও থানা সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ২ জুন র্যাব অভিযান চালিয়ে সিরাজগঞ্জের একটি এলাকা থেকে ফেনসিডিলসহ চার ব্যক্তিকে আটক করে। র্যাবের পক্ষ থেকে ওই দিন সলংগা থানায় মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে চার ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার একজন আসামি শরীয়তপুরের ব্যাপারী কান্দি গ্রামের মানিক মিয়া। তার বাবার নাম ইব্রাহীম মৃধা। কিন্তু আটক হওয়ার পর তার বাবার নাম পাল্টে নজরুল হাওলাদার পরিচয় দেন। সলংগা থানার পুলিশ মানিকের দেয়া নাম ঠিকানার ওপর ভিত্তি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

সিরাজগঞ্জ বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। ওই চার আসামিকে চার বছর করে কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে মো. মানিক মিয়া পলাতক থাকায় তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন আদালত।

অন্যদিকে, ওই মাদক মামলায় মানিক মিয়ার বদলে মানিক হাওলাদারকে গ্রেফতারের পর তার পরিবার ৩০ নভেম্বর শরীয়তপুর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জামিনের আবেদন করেন। একই সঙ্গে তিনি প্রকৃত আসামি নন তার স্বপক্ষেও কাগজপত্র উপস্থাপন করা হয়। তখন আদালতের বিচারক সখিপুর থানার গ্রেফতারি পরোয়ানা তালিম করা সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শামসুর রহমানকে আদালতে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করার নির্দেশ দেন।

৯ ডিসেম্বর এএসআই শামসুর রহমান আদালতে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন, গ্রেফতারি পরোয়ানায় আসামি হিসেবে লেখা নামের সঙ্গ মিলে যাওয়ায় এবং এই নামে অন্য কোনো ব্যক্তি না থাকায় তিনি মানিক হাওলাদারকে গ্রেফতার করেছেন। ২০০৯ সালে গ্রেফতার হওয়ার পর সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে তার যে আসামির ছবি সংরক্ষিত আছে তার সঙ্গে বর্তমানে কারাবন্দি ব্যক্তিকে মিলিয়ে দেখার অনুরোধ জানান এই পুলিশ সদস্য। এরপর আদালতের নির্দেশে শরীয়তপুর কারাগার থেকে মানিক হাওলাদারকে সিরাজগঞ্জ কারাগারে পাঠানো হয়।

মাদক দ্রব্য আইনের মামলায় চার বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত মো. মানিক মিয়ার পরিবর্তে বর্তমানে কারাগারে থাকা মানিক হাওলাদারের মুক্তি চেয়ে তার স্ত্রী সালমা বেগম গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে আবেদন করেন। সালমার আবেদনে মানিককে সশরীরে আদালতে হাজির করা, তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়া এবং এ ঘটনায় মানিক হাওলাদারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

গত বুধবার (৩ মার্চ) বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ শুনানি শেষে আগামী ৭ মার্চ এ বিষয়ে শুনানির জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন। এ বিষয়ে তদন্ত করে ওইদিন শরীয়তপুরের পুলিশ সুপারকে (এসপি) প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

মানিকের স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী মানিক হাওলাদার নদীতে মাছ শিকার করেন। মাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। চার শিশু সন্তান নিয়ে আমাদের অভাবের সংসার ভালোই কাটছিল। হঠাৎ কোন অভিশাপ নেমে এলো আমাদের সংসারে। বিনা দোষে আমার স্বামী তিন মাস যাবত কারাগারে আছেন। কবে ছাড়া পাবেন তাও জানি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘তার জামিন করাতে ধার-দেনা করে এ পর্যন্ত তিন লাখ টাকা খরচ করেছি। মাদকের মতো ঘৃণ্য মামলার কলঙ্ক দিয়ে আমার স্বামীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এর দায় কে নেবে? এর সঠিক সমাধান চাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সখিপুর ইউনিয়নের ব্যাপারী কান্দি গ্রামের দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক মানিক মিয়ার বাবা ইব্রাহীম মৃধা। ইব্রাহিম মৃধা বিষয়টি স্বীকার করেন বলেন, ‘ওই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মানিক মিয়া আমার ছেলে। নামের আংশিক মিল থাকার কারণে পাশের গ্রামের আরেক মানিককে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। বিষয়টি নিয়ে আমিও লজ্জিত। নিরীহ ওই ছেলেটি যাতে মুক্তি পায় সে জন্য শরীয়তপুরের আদালতেও গিয়েছিলাম। কিন্তু আদালত আমার কথা আমলে নেয়নি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান হাওলাদার বলেন, ‘গ্রেফতারি পরোয়ানা আসামির নাম ও বাবার নামে মিল থাকায় মানিক হাওলাদারকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এতে পুলিশের কোনো ভুল নেই। জাতীয় পরিচয়পত্র ও গ্রেফতারি পরোয়ানা মিলিয়ে দেখা গেছে গ্রেফতার হওয়া মানিক হাওলাদার ও দণ্ডপ্রাপ্ত মানিক মিয়া দুজন আলাদা ব্যক্তি।’

মো. ছগির হোসেন/এসজে/জেআইএম