চারিদিকে রাজ্যের কথাবার্তা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হই চই। তোলপাড়। যে যার মত বলছেন। বলতেই পারেন। ফেসবুকটাই নিজের ভাব প্রকাশের জায়গা। যে যার অনুভব, উপলব্ধি শেয়ার করার অধিকার রাখেন। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরমেন্স ও টানা তিন ম্যাচ হার নিয়ে কতজন কতরকম কথা বলছেন, লিখছেন।
তবে খুব মন দিয়ে খেয়াল করলাম বেশিরভাগ লেখা, পোস্ট, স্ট্যাটাস আর কমেন্ট হলো বিষোদগারে পূর্ণ। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ওপর ভিত্তি করে লেখা। যে যাকে পছন্দ করেন, তাকে নিরাপদে রেখে অপছন্দর জনকে ধুয়ে দিচ্ছেন।
প্লিজ আসুন দয়া করে এসব বাদ দেই। আমার পছন্দের পারফরমার দায়মুক্ত। তার কোন দোষ নেই। তার ব্যর্থতা নেই। তিনি ঠিক আছেন। আর বাকি সবাই ব্যর্থ। এই মানসিকতা থেকে দয়া করে সরে আসি। সবার আগে স্বীকার করি এবং সেটা দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে; যাকে বলে অকপট স্বীকারোক্তি, ‘আমরা টি-টোয়েন্টি ভাল খেলি না।’
ওয়ানডেতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং ও বোলিংয়ে একটা স্থিতি আছে। কখন কোন সময় কী কাজ করতে হবে? শুরুর ধরন কি হবে? মাঝখানে কি করতে হবে? আর শেষাংশের করণীয়ই বা কি? বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বড় অংশের তা ভাল জানা। তারা সে কাজগুলো মোটামুটি করতে পারেনও।
তাই ওয়ানডেতে দ্বি-পাক্ষিক সিরিজই শুধু নয়, বিশ্বকাপের বড় মঞ্চেও সাফল্যের দেখা মিলছে। সর্বশেষ ওয়ানডে বিশ্বকাপেও আফগানিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর দক্ষিণ আফ্রিকার মত দলকে হারানোর কৃতিত্ব রয়েছে বাংলাদেশের।
কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে তা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। কারণ আমাদের টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ওই করণীয় কাজ করার মত কোয়ালিটি পারফরমার খুব কম। নেহায়েত হাতে গোনা। দলে একজন আশরাফুল, আফতাব আর তামিমের অভাব সু-স্পষ্ট।
সেই যে ২০০৭ সালে আশরাফুল আর আফতাবের হাত ধরে ওয়েষ্ট ইন্ডিজের সঙ্গে মূল পর্বে জয় ধরা দিয়েছিল, তারপর সে জয় হযে দাঁড়িয়েছে ‘সোনার হরিণ’। কে জানে কবে সে সোনার হরিণের দেখা মিলবে।
আসলে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ভাল খেলার যে অপরিহার্য্য ও অত্যবশ্যকীয় উপাদান এবং কার্যকর রসদ লাগে, তার অনেকটাই নেই আমাদের। আর থাকলেও ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্টে কম। কিছু দুর্বলতা, ঘাটতি আর সীমাবদ্ধতা একদম খালি চোখেই ধরা পড়ে।
পাওয়ার প্লে কাজে লাগিয়ে হাত খুলে খেলার ওপেনারের তীব্র সংকট। যারা আছেন, তারাও অফ ফর্মে। ৬ ওভারে অন্তত ওভার পিছু ৭-৮ রান করা বহুদুরে, উইকেটে টিকে থাকার কাজটাই করতে চরম ব্যর্থ।
যে কারণে ওই পাপুয়া নিউগিনির মত অতি দুর্বল দল ছাড়া স্কটল্যান্ড, ওমান, শ্রীলঙ্কা, ইংল্যান্ড আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ- সবার সাথে পাওয়ার প্লে’তে গড়পড়তা ২ থেকে ৩ উইকেট খোয়া গেছে। ২৫-৩০ রানের বেশি করা সম্ভব হয়নি। শুরুর ধাক্কা সামলে মাঝখানে ইনিংস মেরামতের পারফরমার খুব কম।
মুশফিকুর রহিম আর অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ইনিংসকে নতুন করে সাজাতে পারেন। তবে এরমধ্যে মুশফিক দলকে এগিয়ে নেবার কাজটা সঠিকভাবে করার চেয়ে ইদানিং পছন্দের আর মনগড়া শট খেলায় ব্যস্ত। আর তাতেই ঘটছে বিপত্তি। একটা সময় সেই পছন্দের শটে ঘটছে ইনিংসের অপমৃত্যু।
এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেই মুশফিক তিন-তিনবার এই রিভার্স সুইপ না হয় স্কুপ করতে গিয়ে অকালে উইকেট বিষর্জন দিয়ে এসেছেন। তাতে করে তার মত নির্ভরযোগ্য উইলোবাজের আর শেষ বল পর্যন্ত উইকেটে থেকে দলকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যাবার কাজটা আর হচ্ছে না।
সাথে শেষ দিকে বিশেষ করে শেষ ৫ ওভারে শক্তি-সাহসকে পুঁজি করে বিগ হিট নেওয়ার পারফরমার নেই বললেই চলে। অধিনায়ক রিয়াদ চেষ্টা করেছেন সাধ্যমত; কিন্তু আর কেউ তাকে সাহায্যর হাত বাড়িয়ে দিতে পারেননি। রিয়াদের একার পক্ষে যতটা সম্ভব হয়েছে, ততটাই হয়েছে।
কিন্তু কঠিন সত্য হলো, তা পর্যাপ্ত ছিল না। প্রকৃত অর্থে ফিনিশার, ক্লিন হিটার বলতে যা বোঝায়, তার ভীষণ অভাব অনুভুত হয়েছে। আফিফ হোসেন ধ্রুব আর নুরুল হাসান সোহান সে কাজ করতে হয়েছেন চরম ব্যর্থ। অন্তত একজন ক্লিন হিটার থাকলে স্কটল্যান্ড আর কাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে ক্লোজ ম্যাচে হারতে হতো না। জয় ধরা দিত।
বোলিং অনেকটাই সাকিব নির্ভর। যাকে ধরা হয় প্রধান স্ট্রাইক বোলার, সেই মোস্তাফিজ জায়গামত ব্যর্থ। একবার নয়। বারবার। উইকেট পেলেও জায়গামত করণীয় কাজটা করতে পারছেন না মোস্তাফিজ। অতিমাত্রায় স্লোয়ার এবং কাটার নির্ভরতায় এ বাঁ-হাতি বোলিং কার্যকরিতা অনেক কম হয়েছে।
সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করার বদলে প্রয়োজনীয় সময় ভুল লাইন ও লেন্থে আলগা বোলিং করেছেন প্রচুর। গুরুত্বপূর্ণ সময় রান গতি কমানো, ভাইটাল ব্রেক থ্রু দিয়ে দলকে ম্যাচে ফেরানোর চেয়ে স্লগে এক ওভারে ১৪-১৫ রান দিয়ে সর্বনাশ ডেকে এনেছেন মোস্তাফিজ। নতুন বলে এবং ডেথ ওভারের জন্য কোয়ালিটি বোলারের অভাব পরিষ্কার।
তাসকিন আর সাইফউদ্দিনও প্রত্যাশা মেটাতে পারেননি। এবারের টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ডকাপে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো রিভিউ করুন। এর সবকটার দেখা মিলবে। এখন নিজেরাই ভেবে দেখুন, ‘এই এতগুলো ঘাটতি, দূর্বলতা আর সীমাবদ্ধতা রেখে কি আর ওয়ার্ল্ড লেভেলে সফল হওয়া যায়? যায় না। যেতে পারে না। আর তাই পরিণতি যা হবার তাই হয়েছে।’
তবে কিছু কিছু জায়গায় এরচেয়ে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ পারসেন্ট ভাল খেলার সামর্থ্য আছে টাইগারদের। লক্ষ্য, পরিকল্পনায় ভুল এবং অ্যাপ্রোচে সমস্যা থাকায় সেটা হয়নি। কাজেই আসলে দরকার আবার প্রথম থেকে শুরু করা। ইংল্যান্ডের মত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। সবার আগে একটা প্রকৃত পর্যালোচনা ও নির্ভুল মূল্যায়ন দরকার।
কোন কোন জায়গায়, কোন কোন পজিশনে দূর্বলতা- ঘাটতি আছে? কার বড় মঞ্চে পারফর্ম করার সাহস, পর্যাপ্ত মেধা ও সামর্থ্য আছে? কার নেই বা থাকলেও কম- তা যাচাই বাছাই বা মূল্যায়নের এখনই সময়।
এর মধ্যে কিছু জায়গায় দূর্বলতা, ঘাটতি একদম খালি চোখেই ধরা পড়ে। যেমন, ওপেনিং, মিডল অর্ডার আর লেট অর্ডারে অন্তত তিন-তিনটি পজিসনে বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে।
ওপরের দিকে লিটন দাস, নাইম শেখ আর সৌম্য সরকারের দিকেই বারবার চোখ রাখার চেয়ে রনি তালুকদার, নাজমুল হোসেন শান্ত, সাইফ হাসান, ইমরানউজ্জামানদেরও খুঁটিয়ে দেখা যেতে পারে। মাঝখানে শুভাগত হোম হতে পারেন আদর্শ বিকল্প। ব্যাটিং, বোলিং আর ফিল্ডিং তিনটিই সমান সচল এ অলরাউন্ডারের।
পাশাপাশি নাসির হোসেনকেও আবার তৈরি করা যায় কি না? সে চিন্তাও করা যেতে পারে। নাসিরের ক্রিকেটবোধ, উপস্থিত বুদ্ধি এবং সাহস- এগুলোও কেউ পূরণ করতে পারছে না।
পাশাপাশি একজন সত্যিকার পেস বোলিং অলরাউন্ডারের খুব প্রয়োজন। এখনকার প্রজন্ম তার মাঠের বাইরের কর্মকান্ড নিয়ে সমালোচনামুখর, কিন্তু কঠিন সত্য এ মুহূর্তে টিম বাংলাদেশে একজন খালেদ মাহমুদ সুজন আর মোহাম্মদ রফিকের খুব দরকার। যারা বোলিংয়ের পাশাপাশি শেষ দিকে হাত খুলে খেলতে পারবেন।
বারবার প্রমাণ হয়েছে, সাইফউদ্দিনের বিগ ম্যাচ টেম্পরামেন্ট কম। নার্ভাস হয়ে পড়েন। তার বিকল্প খোঁজার এখনই সময়। বড় আসরে যে মেজাজ ও টেম্পরামেন্ট, তা খুব কম সাইফউদ্দিনের। তার জায়গায় একজন জেনুইন মিডিয়াম পেসার কাম মিডল- লেট অর্ডার খুঁজে বেড় করা খুব জরুরি।
কামরুল ইসলাম রাব্বি। গত দুই বছর ঘরোয়া ক্রিকেটে বেশ ভালো খেলছে। গত বছরও প্রিমিয়ার টি-টোয়েন্টি লিগে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীদের একজন ছিলেন। কিন্তু তাকে বিবেচনায় আনা হচ্ছে না। তার সুনিয়ন্ত্রিত এবং স্লোয়ার ডেলিভারির প্রশংসা শোনা যায় খালেদ মাহমুদ সুজন, সারোয়ার ইমরানসহ অনেক কোচ এবং ক্রিকেটারের মুখেও।
এছাড়া আফিফ, সোহান আর শেখ মেহেদির যে বিগ হিট নেয়ার সামর্থ্য আছে, তার যথাযথ বিকাশ অতি জরুরি। তাদের বিবেচনায়ই আনা হয়েছে বিগ হিটার হিসেবে। কিন্তু একজনও জায়গামত সে কাজটি করতে পারেননি। তারা কী করলে জায়গামত বিগ হিট নিতে পারবেন? সে কাজ করতে হবে। এবং সে দায়িত্ব নিতে হবে ব্যাটিং কোচের। কী করে সোহান, আফিফ আর মেহেদির মনের জোর বাড়ানো যায় এবং কী করলে তাদের মনোযোগ ও মনোসংযোগ বৃদ্ধি পাবে- সে দাওয়াই দেয়া একান্তই জরুরি।
এসব কাজে যদি পেছন ফিরে তাকাতে হয়, হবে। পাকিস্তান এখনো মধ্য তিরিশ পেরিয়ে প্রায় চল্লিশে পৌঁছে যাওয়া মোহাম্মদ হাফিজ আর শোয়েব মালিককে খেলিয়ে সুফল পাচ্ছে। তারা কার্যকর ভুমিকা রাখছেন। দলে জেতাচ্ছেন।
তাহলে অভিজ্ঞ জিয়াকে সুযোগ দিলে দোষ কোথায়? ঘরোয়া ক্রিকেটে জিয়া এখনো হাত খুলে বড় বড় ছক্কা হাঁকাচ্ছেন। কিন্তু অযত্নে-অবহেলায় এ ফ্রি ও ক্লিন হিটারকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। সময় হয়েছে রনি তালুকদার, বিজয়, শুভাগত হোম ও নাসিরদের দিকে তাকানোর। তাদের ঘঁষে-মেজে তৈরি করা যায় কি না, তা ভাবার।
সামনে বিপিএল। টিম ম্যানেজমেন্ট ও নির্বাচকদের মূল কাজ হোক, সেই আসরে যারা ভাল পারফরম করেন, তাদের দিয়ে ২০২২-এর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য একটা ২২-২৩ জনের প্রাথমিক দল তৈরি করা এবং তাদের টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের জন্যই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। তার আগে টিম ম্যানেজমেন্ট, হেড কোচ, স্পেশালিস্ট কোচ এবং নির্বাচকদের বোধোদয় প্রয়োজন। এ দল দিয়ে হবে না। অন্তত কয়েকটি পজিশনে বিকল্পের অনুসন্ধান করতেই হবে। এ বোধোদয় ও উপলব্ধি এবং বিকল্প খুঁজে বের করার কাজ অতি জরুরি।
এআরবি/আইএইচএস