দেশজুড়ে

শ্বশুরবাড়ির লোকের নির্যাতনে গর্ভের সন্তান নষ্ট হলো নারীর!

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলায় শাপলা বানু (২৩) নামে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে স্বামীর স্বজনদের বিরুদ্ধে। এতে ওই নারীর গর্ভের পাঁচ মাসের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তিনি নওগাঁ সদর হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন।

শাপলা বানু নওগাঁ সদর উপজেলা বলিহার ইউনিয়নের কুরমইল গ্রামের আব্দুস সাত্তারের মেয়ে। তার স্বামী বায়েজিদ চৌধুরীর (২৫) বাড়ি মহাদেবপুর উপজেলার শরিফপুর গ্রামে। তার বাবার নাম খইবর চৌধুরী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাপলা বানু ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ করতেন এবং বায়েজিদ চৌধুরী রডের মিস্ত্রী। ২০১৬ সাল থেকে তাদের মধ্যে ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ সম্পর্ক থেকে ২০২০ সালে তারা গোপনে বিয়ে করেন। মেয়ের পরিবার বিয়ের বিষয়টি জানলেও ছেলের পরিবার বিষয়টি জানতো না। বিয়ের পর থেকে শাপলা তার বাড়িতে থাকতেন। সেখানে বায়েজিদ চৌধুরী খরচ বহন করতেন।

গত তিন মাস থেকে শাপলার সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে খরচও বন্ধ করে দেন বায়েজিদ। এর মধ্যে বায়েজিদের এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন শাপলা। তার কাছ থেকে জানতে পারেন বায়েজিদ কয়েকদিন আগে খঞ্জনপুরে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য গত শুক্রবার (৮ এপ্রিল) বিকেল ৪টার দিকে শাপলা তার স্বামী বাড়িতে যান। সেখানে গেলে শাপলা যে বায়েজিদের স্ত্রী তা সবাইকে জানান। তবে বিষয়টি অস্বীকার করে ক্ষিপ্ত হয়ে বায়েজিদের চাচাতো ভাই নাজমুল চৌধুরী ও চাচা কুদ্দুস চৌধুরী তাকে নির্যাতন করাসহ পেটে লাথি মারেন। এতে গুরুতর আহত হন শাপলা। পরে খবর পেয়ে শাপলাকে তার চাচাতো ভাই নুরুল ইসলাম উদ্ধার করে বাড়ি আনেন। অবস্থা বেশি খারাপের দিকে গেলে রোববার (১০ এপ্রিল) নওগাঁ সদর হাসপাতালে গাইনি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে বলে চিকিৎসক নিশ্চিত করেন।

ভুক্তভোগী গৃহবধূ শাপলা বানু বলেন, দুই বছর আগে আমরা গোপনে বিয়ে করি। কিন্তু বিষয়টি স্বামীর পরিবার জানতো না। এরপর আমি বাবার বাড়িতে থাকতাম। স্বামী বায়েজিদ চৌধুরী নিয়মিত খরচ বহন করতো। তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা বললে বিভিন্ন তালবাহানা করতো। গত তিনমাস থেকে সে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়। এমনকী ঠিকমতো খরচও দিতো না। তার এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সে বিয়ে করেছে বলে জানায়।

তিনি বলেন, বিষয়টি জানার পর স্বামীর বাড়িতে গিয়েছিলাম স্ত্রীর অধিকার পেতে। কিন্তু উল্টো আমাকে স্বামীর চাচাতো ভাই নাজমুল চৌধুরী ও চাচা কুদ্দুস চৌধুরী নির্যাতন করে পেটে লাথি মারে। এতে অসুস্থ পড়লে আমাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নেওয়া হয়। অবস্থা বেশি গুরুতর হওয়ায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। আমার গর্ভে থাকা পাঁচ মাসের সন্তানও নষ্ট হয়েছে। আমি আমার সন্তান হত্যার বিচার ও স্ত্রীর স্বীকৃতি চাই।

গৃহবধূ শাপলা বানুর মা জাহেরা বিবি বলেন, আমরা গরিব মানুষ। স্বামী দীর্ঘদিন থেকে হার্টের রোগী ও লিভারের সমস্যায় ভুগছে। চার ছেলেমেয়ের মধ্যে মেয়ে শাপলা তৃতীয়। মেয়ে ভালবেসে বিয়ে করেছিল। এখন দেখছি মরতে বসেছে। মেয়েকে নির্যাতনের বিচার চাই। সেই সঙ্গে তার স্বামীর স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

বায়েজিদ চৌধুরীর বাবা খইবর চৌধুরী বলেন, গত দুই বছর আগে ছেলে বিয়ে করেছে এ কথা আমি জানতাম না। তবে কিছুদিন আগে আমার ছেলেকে বিয়ে দিয়েছি। গত ৪/৫ দিন আগে ওই মেয়ে (শাপলা) আমার বাড়ি এসে বলে যে আমার ছেলে তাকে বিয়ে করেছে। সেদিন আমার ছেলে বাড়ি ছিল না। এছাড়া তাকে কোনো ধরনের মারধর করা হয়নি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত বায়েজিদ চৌধুরী ও নাজমুল চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বন্ধ পাওয়া যায়।

নওগাঁ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জাহিদ নজরুল চৌধুরী বলেন, শাপলার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন আছে। এখনো তার রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আঘাতের কারণে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে। তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে উন্নতি হয়েছে।

নওহাটা ফাঁড়ির দায়িত্বরত উপ-পরিদর্শক (এসআই) জিয়াউর রহমান বলেন, ওই নারীকে (শাপলা বানু) স্ত্রী হিসেবে ছেলেপক্ষের কেউ মেনে নিতো না। ছেলের পরিবার বিভিন্নভাবে তালবাহানা করতো। মাঝেমধ্যে মেয়েটি ছেলের বাড়িতে যেত। হঠাৎ করে মেয়ে জানতে পারে তার স্বামী আরেকটি বিয়ে করেছে। বিয়ের পর তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে ফাঁড়িতে অভিযোগ দেয়। এরপর ঘটনাস্থলে তদন্তে যাওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, মেয়েটিকে নির্যাতন করা হয়েছে শুনেছি। নির্যাতনে তার গর্ভের বাচ্চাটি নষ্ট হয়ে গেছে। পরবর্তীকালে সে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তবে নির্যাতনে বাচ্চা নষ্টের বিষয়টি অভিযোগপত্রে উল্লেখ ছিল না। হাসপাতালে গিয়ে দেখে আসা হয়েছে বিষয়টি গুরুতর। আমরা চেষ্টা করছি অভিযোগটি এজাহার আকারে নিতে।

আব্বাস আলী/এমআরআর/এএসএম