দেশজুড়ে

পঙ্গুত্ব নিয়েও থেমে যাননি দুই ভাই

হাফিজার শেখ ও টুকুল শেখ আপন দুই ভাই। ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার বাগাট ইউনিয়নের পশ্চিম বাগাট গ্রামের মৃত আসমত শেখের ছেলে। এক বছরের ব্যবধানে সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করেন দুজনই। একজন হারিয়েছেন পা, আরেকজন ভেঙে যায় মেরুদণ্ড।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় স্বাভাবিক জীবন যাপন করতেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এখন তারা শারীরিকভাবে অক্ষম। কিন্তু জীবনযুদ্ধে কখনো থেমে যাননি। সব প্রতিবন্ধকতাকে পিছিয়ে এগিয়ে চলছেন অবিরাম। ইচ্ছে শক্তির ডানায় ভর করে তারা সমাজের বোঝা হননি। দুই ভাই এখন শুধু সফল মানুষই নন বরং স্বচ্ছ সমাজের উদাহরণও বটে।

জমিজমা বলতে কিছুই নেই, আছে কেবল পৈতৃক ভিটা। বর্তমানে হাড়ভাঙা পরিশ্রমে নিজেদের প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত তারা। পান ও মুদি দোকান করে চলছে দুই ভাইয়ের জীবন সংসার। ছোট্ট একটি দোকানে বিভিন্ন পণ্য থাকলেও মূলত তাদের ব্যবসা পানের। পানের জন্য তাদের দোকানে লাইন দিয়ে থাকেন ক্রেতারা।

স্থানীয়রা জানান, বড় ভাই হাফিজার নসিমন চালাতেন ও তার ছোট ভাই টুকুল ট্রাকচালক ছিলেন। গত আট বছর আগের কথা। এক বছরের ব্যবধানে সড়ক দুর্ঘটনায় একজনের পা আরেক জনের মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। এরপর তারা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলেও সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এরপর পঙ্গু জীবন নিয়ে কী করবে তা নিয়ে দেখা দেয় অনিশ্চয়তা। চিন্তায় কাটছিল তাদের দিন-রাত।

পরে দুই ভাই বাগাট বাজারে পানের দোকান দেন। সেই থেকে তাদের সফলতা শুরু। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সিরিয়াল দিয়ে পান খান ক্রেতারা। প্রতিদিন যে পান বিক্রি হয় এতেই তাদের সংসার চলে যায় বেশ ভালোভাবে। হাফিজারের দুই ছেলে আর টুকুলের দুই মেয়ে এক ছেলে।

মকিম শেখ, ইনামুল হাসান, মহিউদ্দিন শেখ, শরিফ হোসেনসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, তারা দুই ভাই সমাজের ভালো ও আত্মবিশ্বাসী মানুষের জন্য একটা দৃষ্টান্ত। তাদের দোকানে পান খেতে হলে লাইনে দাঁড়াতে হয়। ভালো, ভেজাল মুক্ত ও সুস্বাদু পান বিক্রি করেন তারা। যার কারণে তাদের পানের এত চাহিদা। এছাড়া গরীব অসহায় মানুষদের বিনামূল্যেও পান খাওয়ান দুই ভাই।

বাগাটের বাসিন্দা ও কাদিরদি ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক বাবু দেব প্রসাদ রায় জাগো নিউজকে বলেন, তাদের হাতের পানের সু-নাম আছে। তারা দুই ভাই সফল মানুষ। শুধু তাই নয়, বরং স্বচ্ছ সমাজের উদাহরণও বটে।

টুকুল শেখ জাগো নিউজকে বলেন, আমরা সততার সঙ্গে প্রায় ছয় বছর খিলি পানের ব্যবসা করে আসছি। প্রতিটি খিলি পানের দাম দুই টাকা থেকে শুরু। পাঁচ টাকা দশ টাকা দামের পানও বিক্রি করা হয়। প্রতিদিন গড়ে প্রায় হাজারের অধিক পান বিক্রি হয়। আমরা সমাজের বোঝা হয়ে নয়, আত্মনির্ভরশীল হয়ে সততার সঙ্গে পান বিক্রি করে জীবন যাপন করছি। যা আল্লাহর দয়া আর মানুষের ভালোবাসা। তবে যে কোনো মানুষ সততার সঙ্গে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যে কোনো কর্ম করলে আজ হোক কাল হোক সফলতা আসবেই।

বড় ভাই হাফিজার শেখ জাগো নিউজকে বলেন, আগে নসিমন চালিয়ে সংসার চালাতাম। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছিলাম। পরে ছোট ভাইকে নিয়ে পান দোকান দেই। এখন পান বিক্রি করি। এ পানের দোকানের ওপর আমাদের সংসার চলে। আল্লাহর দয়ায় খেয়ে-পড়ে ভালোই চলছে। মানুষের ইচ্ছে শক্তি আর আত্মবিশ্বাস, সততা থাকলে এগিয়ে যাওয়া যায়।

তিনি আরও বলেন, আমাদের জায়গা-জমি কিছুই নেই। এ দোকানের ওপরই সবকিছু। আমাদের কিছুই চাওয়ার নেই। কিন্তু আমাদের দেখাদেখি সমাজের আর পাঁচটা মানুষ যদি সততার সঙ্গে কর্ম করে নিজেদের জন্য, দেশের জন্য কিংবা সমাজের জন্য ভালো কিছু করতে পারে তবেই সার্থকতা।

এ বিষয়ে বাগাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মতিয়ার রহমান খান জাগো নিউজকে বলেন, তারা দুই ভাই খুবই ভালো মানুষ। আচার-আচরণও ভালো। তারা সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত। তাদের দেখাদেখি অনেকেই আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছেন। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তাদের দোকান থেকে পান খান।

এন কে বি নয়ন/এসজে/এএসএম