ব্রিটিশ শাসনামলে তৈরি একটি অন্যতম প্রাচীন জেলা ফরিদপুর। সুপ্রাচীনকাল থেকেই এখানে অনেক কীর্তিময় গৌরবগাথা রয়েছে। আউলিয়া-দরবেশের আবাসভূমি হিসেবে এ অঞ্চল সুপরিচিত। ১৭৮৬ সালে এ স্থানের নাম ছিল ‘জালালপুর’। ১৮০৭ সালে ঢাকা বিভক্ত হওয়ায় এটি ‘ফরিদপুর’ জেলা নামে অভিহিত হয়। ফরিদপুরের পূর্বনাম ছিল ‘ফতেহাবাদ’।
এ জেলারই প্রাচীন স্থাপনা ‘শাহ ফরিদ জামে মসজিদ’। জেলা প্রশাসকের অফিসের সামনে অবস্থিত মসজিদটি। খ্রিষ্টপূর্ব ১৩০০ সালের দিকে এখানে এটি দরগাহ ছিল। এরপর সেখানে ১৯৬২ সালে একটি মসজিদ স্থাপিত হয়। প্রখ্যাত সাধক ও দরবেশ খাজা মাইনউদ্দিন চিশতীর (র.) শিষ্য প্রখ্যাত সুফি সাধক শাহ শেখ ফরিদউদ্দিনের (র.) নামানুসারে এ জেলার নামকরণ হয়েছে ফরিদপুর। ফতেহাবাদকে ‘ফরিদপুর’ নামকরণে যে দু’জন সুফি সাধক বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানসহ ফরিদপুরেও এসেছেন এবং ইসলাম প্রচারে কিংবদন্তি হয়েছেন, তাঁদের একজন হজরত মাওলানা শেখ ফরিদউদদীন মাসুদ গঞ্জেশকর (র.) এবং অপরজন হজরত মাওলানা শেখ ফরিদউদদীন আত্তার। তারা দু’জনই অতি উচ্চ মর্যাদার কামেল লোক ছিলেন। ইসলামের বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক সাধনা দ্বারা নিজ নিজ জীবনকে সুসংহত করেছিলেন। শেখ ফরিদউদদীন আত্তারের প্রকৃত নাম শেখ মুহাম্মাদ ইবনে আবু বাকার ইব্রাহিম। তার ডাকনাম ছিল ফরিদ উদদীন। তিনি আতরের ব্যবসায়ী ছিলেন বলে লোকে আত্তার বলেও জানতেন। এ নামেই তিনি বহুল পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তিনি একজন কবি ও চিকিৎসক ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাহ ফরিদ দরগাহ মসজিদ নিয়ে রয়েছে নানা ঘটনা, কিসসা-কাহিনি। শিরনি-মানত, অলৌকিক কাহিনি অথবা সত্য ঘটনা, এমন হাজারো কল্পকাহিনি রয়েছে। জনশ্রুতি আছে, এখানে বিশাল আকৃতির বটগাছ ছিল। সেখানে বাস ছিল বুড়ো বুড়ো শকুনের। বটগাছটি কেটে ফেলার সময়ে গাছের মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছিল এবং সেটি কোনো ভুতুড়ে গল্প ছিল না। ভয়ে কাঠুরেরা কুড়াল নিয়ে পালিয়েছিলেন। গাছ কাটার দায়িত্বরত ব্যক্তি বেশ কিছুদিন দুরারোগ্য রোগে ভুগে মারা যান। নরেন সাহা নামে এক ভদ্রলোক তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেছিলেন যে, এমন দুঃসাধ্য কাজ করা ঠিক হয়নি। বটগাছটি কেটে ফেলার উনিশ দিনের মাথায় ফরিদপুর শহরে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা ঘটে। তদন্তকারীরা রিপোর্ট দেন, শকুনের ডানার সাথে হেলিকপ্টারের পাখার সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
ড. গোলাম সাকলায়েনের ‘বাংলাদেশের সুফী সাধক’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, ‘মধ্যযুগের প্রারম্ভে হজরত শেখ ফরিদ উদ্দীন গঞ্জেশকর বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে এসে ফরিদপুর ও চট্টগ্রামসহ অন্যান্য অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন। তার মিশনারী কাজের ধরন ছিল বিভিন্ন স্থানে তাঁবু গেড়ে নিজের সাধনার কাজে অগ্রসর এবং আগন্তুকদের ইসলামে দীক্ষা দেওয়া। তার এরূপ কাজের সন্ধান মেলে ফরিদপুর সদর উপজেলায় মুজিব সড়কে বর্তমান শাহ ফরিদ জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে ষাটের দশকে দরগাহ নামীয় স্থানের জনশ্রুতি থেকে। তৎকালীন তার অনুগামীদের নিয়ে এখানকার বটতলায় উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে তাঁবু গেড়ে কিছুদিন অবস্থান করেন। স্থানটি পাকিস্তান ডিসট্রিক্ট গেজেটিয়ার (নুরুল ইসলাম খান সিএসপি) সম্পাদিত পীরস্থান হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। এখানে তিনি অনুগামীদের আধ্যাত্মিক সাধনার দীক্ষা দিতেন এবং ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে আগ্রহী আগন্তুকদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করতেন।’
এলাকাবাসী ও প্রবীণরা জানান, বিখ্যাত সুফী সাধক হযরত মাইনউদ্দিন চিশতীর (র.) শিষ্য কামেল ব্যক্তিত্ব হযরত শাহ ফরিদ (র.) ইসলাম প্রচারের জন্য ফরিদপুর ও চট্টগ্রাম সফর করেন। ধারণা করা হয়, ইসলাম প্রচারের জন্য সফরের সময় সঙ্গী-সাথী নিয়ে ফরিদপুরের এ জায়গায় বিশ্রাম নেন। সে সময় এখানে একটি বটগাছ ছিল। এ বটগাছের নিচেই তিনি বিশ্রাম নেন এবং জায়গাটিতে অবস্থান করেন। জায়গাটি তার ভালো লেগে যায় এবং এখানে একটি বিশ্রামাগার তৈরি করেন। এখান থেকেই তিনি ধর্ম প্রচার করতেন এবং ভক্তদের উদ্দেশে ওয়াজ-নসিহত করতেন। পরে এটি শাহ ফরিদ দরগাহ নামে পরিচিত লাভ করে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৩০০ সালের দিকে দরগাহটি তৈরি করা হয় বলে ধারণা পাওয়া যায়। এ দরগাহর সাথে রয়েছে প্রাচীন ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়। ফরিদপুর নাম পত্তনের উৎস সঠিক জানা না গেলেও এ শাহ ফরিদের (র.) নাম অনুসারে আধুনিক ফরিদপুরের নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৬২ সালে মাওলানা আতাউর রহমান তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. ইদ্রিসের সহায়তায় শাহ ফরিদ জামে মসজিদটি তৈরি করেন। প্রথমে এটি টিনের তৈরি মসজিদ ছিল। পরে সেখানে গড়ে উঠেছে দুই গম্বুজ বিশিষ্ট তিন তলার সুদৃশ্য মসজিদ।
লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা ওয়াহিদ সিকদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে আমার বয়স প্রায় ৬০ বছর। এখানে এক সময় ঝাউগাছ, বটগাছ ছিল। আমার জন্মের পর থেকেই বাপ-চাচার মুখে এই মসজিদের নাম শুনে আসছি, দেখে আসছি। ছোটবেলা থেকে এখানে এসে বদনায় করে দুধ খেয়েছি। এখনো দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে, দান-মানত করে। আস্তে আস্তে মসজিদটির অনেক উন্নয়ন করা হয়েছে।’
ব্যাংক কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘শাহ ফরিদ জামে মসজিদের সঙ্গে ফরিদপুর নামের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এটি একটি পুরোনো ঐতিহাসিক মসজিদ। পাশেই ডিসি ও এসপি অফিস। প্রশাসনের লোকজন ছাড়াও স্থানীয়, দূর-দূরান্তের অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করেন।’
মসজিদের খাদেম এলেম প্রামানিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার বাড়ি রাজবাড়ীর খানখানাপুর গ্রামে। মসজিদটি কত বছর আগের জানা নেই। তবে অনেক পুরোনো ও ঐতিহাসিক একটি মসজিদ। এলাকাবাসী ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিরা আসেন নামাজ আদায় করতে।’
মুয়াজ্জিন আবুল হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি প্রায় ২৪ বছর ধরে এ মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে আছি। আমার জানামতে, শুরুটা কয়েকশ বছর আগে। তবে যতটুকু জানি, ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন টিনের ছিল। এরপর ১৯৯৭ সালে নতুন করে তিন তলা নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৮ সালে তিন তলা উদ্বোধন করা হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসলমান এখানে নামাজ আদায় করেন।’
মসজিদের ইমাম হোসাইন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি এখানে প্রায় একযুগ ধরে ইমামতির দ্বায়িত্বে আছি। এটি একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে মসজিদের তিন তলা পর্যন্ত পূর্ণ হয়ে যায়। এক হাজারের বেশি মুসল্লির সমাগম ঘটে এখানে।’
এসইউ/জেআইএম