দেশজুড়ে

টাঙ্গাইলে আখ চাষিদের মুখে হাসি

টাঙ্গাইলে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আখের আবাদ কম হয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকাসহ ফলন ভালো হওয়ায় চলতি মৌসুমে লাভবান হচ্ছেন আখ চাষিরা। পাশাপাশি সাথি ফসলেরও (আখের সঙ্গে চাষ করা ফসল) ভালো ফলন পাচ্ছেন তারা। এতে আখ চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে। তবে বাজারে এবার আখের চাহিদা কম বলে দাবি করছেন চাষিরা।

টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ৫০০ হেক্টর জমিতে ২৩ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন আখ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে মাত্র ৩৮৮ হেক্টর জমিতে আখ চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় ২৫০ হেক্টর জমিতে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ১৬০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। এ উপজেলায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন।

গত মৌসুমে জেলায় ৪২২ হেক্টর জমিতে ২০ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন আখ উৎপাদন হয়েছিল।

সূত্র আরও জানায়, বেলে ও বেলে-দোআঁশ মাটি আখ চাষের জন্য উপযুক্ত। ৭-৮ মাসে ফলন পাওয়া যায়। এক মৌসুমের আখ উৎপাদন করতে ধানের দুই মৌসুমের সমান সময় লাগে। তবে আখের পাশাপাশি সাথি ফসল চাষ করায় সার্বিকভাবে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা।

আখ উঁচু-নিচু জমিতেও চাষ করা যায়। আখের পাশাপাশি সাথি ফসল হিসেবে তেল, তিসি, সরিষা, বাদাম, মিষ্টিকুমড়া, আলু, পেঁয়াজ, রসুন এবং ডালজাতীয় ফসলের মধ্যে মটরশুঁটি, ছোলা, মসুর, মুগ ইত্যাদি চাষ করা যায়।

আখ চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আখের পাশাপাশি একই জমিতে সাথি ফসল হিসেবে তেল, মসলা ও ডালজাতীয় ফসলগুলো বিনা সেচে শুধু বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে চাষ করা যায়। আখের পাশাপাশি সাথি ফসল চাষ করলে অনেক বেশি লাভজনক হয়। সাথি ফসল হিসেবে ডালজাতীয় ফসল চাষে জমির ঊর্বরতা শক্তি অনেকাংশে বাড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আখ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সাথি ফসল থেকে আংশিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়।

পেঁয়াজ ও রসুনের পাতায় তীব্র ঝাঁজ থাকায় আখ ক্ষেতে পোকামাকড়ের উপদ্রব কম হয়। জমিতে আগাছাও কম হয়। এতে মূল ফসলের ফলন অনেকাংশে বেড়ে যায়।

সরেজমিনে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ধরেরবাড়ী, পিচুরিয়া, কৃষ্ণপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি ক্ষেতেই হলুদ ও লাল রঙের আখ। ৮-১২ ফুট উচ্চতার প্রতিটি আখ খুচরা ২০-৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ঢাকাসহ অন্য জেলাতেও এখানকার আখ সরবরাহ করা হচ্ছে।

পিচুরিয়া গ্রামের আখ চাষি নুরুল ইসলাম বলেন, এ বছর ৬৪ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করছি। এতে খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। আবাদ অনুসারে জমিতে প্রায় ১০ হাজার আখ হবে। এখনো বিক্রি শুরু করিনি। বিক্রি হলে খরচ বাদে লক্ষাধিক টাকা লাভ হবে আশা করছি।

তিনি আরও জানান, আখের পাশাপাশি সাথি সফল হিসেবে মিষ্টিকুমড়া, খেসারি, আলু, পেঁয়াজ আবাদ করেছিলেন। খেসারি গরুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করছেন। আলু আর পেঁয়াজ নিজ পরিবারের প্রয়োজনে জন্য রাখলেও ১৫ হাজার টাকার মিষ্টিকুমড়া বিক্রি করেছেন।

চাষি সোহরাওয়ার্দী বলেন, চলতি মৌসুমে আমি সাড়ে ৭৪ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করছি। এবার আখের উৎপাদন ভালো হইলেও চাহিদা কম। ব্যাপারী জমিতে কম আসছেন। এ কারণে আখ বিক্রি কম হচ্ছে।

আখ চাষে এখন পর্যন্ত ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে সোহরাওয়ার্দীর। তার আশা পৌনে দুই লাখ টাকার আখ বিক্রি করতে পারবেন। এছাড়া সাথি সফল পেঁয়াজ, আলু, মিষ্টিকুমড়া আর লাউ চাষে খরচ ও বিক্রির টাকা সমান সমান হয়েছে।

৫০ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করেছেন শহিদুল ইসলাম। এতে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। এরই মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার টাকার আখ বিক্রি করেছেন। বাকি রয়েছে ২১ শতাংশ জমির আখ। ব্যাপারী এলে বাকি আখ বিক্রি করা হবে।

শহিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাথি সফল হিসেবে বাধাকপি, মিষ্টিকুমড়া আর বেগুন আবাদ করছিলাম। এর মধ্যে ৩০ হাজার টাকার বাধাকপি, পাঁচ হাজার টাকার মিষ্টিকুমড়া আর ১৯ হাজার টাকার বেগুন বিক্রি করতে পারছি। এখনো অনেক বেগুন বিক্রি করতে পারমু।’

চাষি আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রায় ৪০ বছর ধরে আখের আবাদ করছি। তবে এবারই প্রথম লাভবান হচ্ছি। এবার ফলন ভালো হয়েছে।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আহসানুল বাসার জানান, টাঙ্গাইলে স্থানীয় জাতের পাশাপাশি ঈশ্বরদী-৪১ ও ঈশ্বরদী-৪২ (বিএসআরআই-৪১ ও ৪২) সহ নতুন কিছু উন্নত জাতের আখ চাষ করা হচ্ছে। গতবছর বন্যায় যেসব চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তারা অনেকেই এবার আখ চাষ করেননি। এ কারণে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। তবে এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জেলায় আখের ফলন অনেক ভালো হয়েছে।

এসআর/এমএস