দক্ষ কারিগর, পুঁজি ও বিদ্যুৎ সমস্যায় ধুঁকছে পাবনার সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র (লাইট) ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প। কর্মদক্ষ কারিগর ও পর্যাপ্ত পুঁজি পাওয়া না গেলে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে বলছেন কারখানা মালিকরা। তবে বেকার যুবকদের বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছে। সারাদেশে যেসব জলায় এর ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে তার মধ্যে পাবনা অন্যতম। পাবনা শহরতলি ও বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত তিন শতাধিক ক্ষুদ্র মেশিনারিজ শিল্প গড়ে উঠেছে। কোনো পৃষ্ঠাপোষকতা ছাড়াই ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে এসব শিল্প।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাবনা বিসিক এলাকায় তিনটি আর পৌর সদরের মধ্যে শতাধিক ক্ষুদ্র ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প গড়ে উঠেছে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত যন্ত্রপাতি পাবনার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কারিগরের অভাবে ধুঁকছে। দক্ষ কারিগর তৈরি না হওয়ার নানা কারণ উল্লেখ করেছেন শিল্প মালিকরা।
পাবনার বিসিক গেট এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক বাবু সেখ। ২০০০ সালে ছোট একটি ওয়েল্ডিং মেশিন দিয়ে তার ব্যবসা শুরু করেন। এরপর দীর্ঘ ২২ বছরের পরিশ্রমে নিজের প্রতিষ্ঠানটি বড় করেছেন। তার প্রতিষ্ঠানে এখন ৯ জন দক্ষ কারিগর কাজ করেন। অথচ তার প্রয়োজন অন্তত ৩০ জন শ্রমিক। কিন্তু দক্ষ শ্রমিক পাচ্ছেন না।
কেন দক্ষ শ্রমিক পাচ্ছেন না, এমন প্রশ্নে বাবু সেখ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আসলে দক্ষ শ্রমিক তৈরি হচ্ছে না। এ শিল্পে কাজ করতে হলে তিন সপ্তাহ বা তিন মাস প্রশিক্ষণ দিলেই কাজ শেখা যায় না। কাজ শিখতে হলে অন্তত পাঁচ বছর হাতেকলমে কাজ করা দরকার। অনেকে কাজ শিখতে আসেন পরিণত বয়সে। তখন আর তিনি কাজ শিখতে পারেন না।’
তিনি বলেন, ‘কোনো শিল্প মালিক একজন অদক্ষ শ্রমিককে বেতন দিয়ে বসিয়ে বসিয়ে কাজ শেখাতে পারেন না। আবার বয়স্ক মানুষের পক্ষে পাঁচ বছর শুধু মালিকের কাছ থেকে খাবার পেয়ে কাজ শেখা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে পঞ্চম শ্রেণি পাস শিক্ষার্থীরা কাজে ভর্তি হলে সে একজন দক্ষ শ্রমিক হতে পারে। সে হিসাব-নিকাশ বুঝতে পারে, আবার কাজও ধারণ করতে পারে।’
বাবু সেখ উদাহরণ দিয়ে বলেন, “নীলফামারী জেলার আজকের প্রতিষ্ঠিত ‘ভাই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ’ এর মালিক খুরশীদ আলম। তিনি কিন্তু পঞ্চম শ্রেণি পাস করে পাবনার একটি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে কাজ শিখেছিলেন। আজ তাদের প্রতিষ্ঠান স্বয়ংক্রিয় আটাকল যন্ত্র এবং মিশ্রণ যন্ত্র তৈরি করছে। তারা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিতে বোনমিল এবং মিশ্রণ মেশিন সরবরাহ শুরু করেছে। চীন, ইতালি এবং ভারতের মতো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা তাদের যন্ত্রপাতি বিভিন্ন সিরামিক কারখানাগুলোতে বিক্রি করছেন।
বাবু সেখের প্রতিষ্ঠানে তেল ভাঙানো যন্ত্র, খড় কাটা যন্ত্র, ফিল্টার, গম ভাঙানোর যন্ত্র, ভেকু গাড়ির যন্ত্রাংশ, ধানের হলার, বিভিন্ন কাটিং মেশিন তৈরি করা হচ্ছে।
বর্তমানে লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান বাবু সেখ। তিনি বলেন, ‘নির্দেশনা অনুযায়ী সোমবার প্রতিষ্ঠান থাকছে। শুক্রবারতো কারিগররা কাজ করে না। তাহলে সপ্তাহে দুদিন বন্ধ থাকছে প্রতিষ্ঠান। এর ওপর ঘন ঘন লোডশেডিং প্রতিষ্ঠানের কাজকে দারুণভাবে ব্যাহত করছে। শ্রমঘণ্টা অপচয় হচ্ছে। এতে মালিকপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
পাবনার টার্মিনাল এলাকার বাবুল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, হালকা এ শিল্পের বিকাশে বড় বাধা অর্থায়ন। ঋণ না পেয়ে আমরা ব্যবসার পরিধি বাড়াতে পারছি না। সহজ শর্তে ঋণ পেলে আমরা উপকৃত হতাম।
কারিগর ফজর আলী (৫৫) ও নাসির হোসেন (৪৫) জাগো নিউজকে বলেন, ‘ছোটবেলায় কাজ শিখেছি। এখন প্রতি মাসে বেতন পাই। যা আয় হচ্ছে তাতে বেশ ভালো আছি। দীর্ঘমেয়াদি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিলে এ খাতে কর্মসংস্থানের অভাব নেই।’
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাজমুল হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, এ শিল্পটির সমস্যার মূলে হাতে দিলে দেখা যায় দক্ষ কারিগর আর পুঁজির অভাব এর বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের কৃষিকাজ অলাভজনক হওয়ায় নীতিনির্ধারকদের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টর নিয়ে এখন বেশি করে ভাবা দরকার।
পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সহ-সভাপতি আলী মর্তুজা বিশ্বাস সনি বলেন, ক্ষুদ্র ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে দেশীয় কারিগররা অভাবনীয় নানা মেশিনারিজ তৈরির দক্ষতা দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। কৃষি যন্ত্রপাতি, মোটরসাইকেল যানবাহনের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি ও বিপণনের ক্ষেত্রে পাবনার নামটি ব্যাপকভাবে পরিচিত।
বিসিক পাবনার উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) রফিকুল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পকে বিসিক নানাভাবে সহায়তা করে যাচ্ছে। সরকার বাজেটে কর অবকাশ সুবিধাসহ বেশি কিছু ঘোষণা দিয়েছে। আগামী বছরগুলোতে এ শিল্প একটি ভালো অবস্থানে পৌঁছাবে বলে আশা করি।
এসআর/এএসএম