জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার লক্ষ্যে নানা প্রতিবন্ধকতা জয় করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী রাকিবুল হাসান লিমন। ২২ বছর বয়সী এ তরুণ পলিওমাইলাইটিস উইথ মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত। জন্ম থেকেই তার দুটি হাত থাকলেও তা অকেজো। স্বাভাবিকভাবে সব কিছু বুঝতে পারলেও তার মুখমণ্ডলে ঠোঁটের আকৃতি বাঁকা হওয়ায় কথায় রয়েছে আড়ষ্টতা।
লিমন এবার পা দিয়ে লিখে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। তিনি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়নের বাঘবাড়ি এলাকার শহিদুল ইসলাম রতনের ছেলে। তবে নিজ এলাকায় স্থায়ী কোনো বসতি না থাকায় গাতবলী পৌর এলাকার মাস্টারপাড়ায় ভাড়ায় থাকে তার পরিবার। লিমনের মায়ের নাম লতা খাতুন।
রতন ও লতা দম্পতির সংসারের বড় ছেলে লিমন। এছাড়াও তাহমিস নামের আরও একটি ছেলে রয়েছে তাদের। তবে সে ছেলে পুরোপুরি সুস্থ আছেন।
আরও পড়ুন: প্রতিবন্ধকতা জয় করে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন তুহিন
এতসব শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে উৎফুল্লতার কমতি নেই লিমনের। তিনি বলেন, আমি পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। সব পরীক্ষা ভালো হয়েছে। এবার ইচ্ছে আছে বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে পড়াশোনা করার। পাশাপাশি কম্পিউটার শিক্ষার ট্রেনিং পেলে এ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে আছে। কাজ করে আমি আমার অসচ্ছল পরিবারের হাল ধরবো একদিন।
লিমনের বাবা শহিদুল ইসলাম রতন পেশায় একজন পান দোকানদার। বগুড়া শহরের আল আমিন কমপ্লেক্সের নিচে ছোট্ট এক দোকান দিয়ে চলে তাদের চার সদস্যর এ পরিবার। টাকার অভাবে তিনি কখনো ছেলের চিকিৎসা করাতে পারেননি।
আরও পড়ুন: যেভাবে প্রতিবন্ধকতা জয় করছেন কানিজ ফাতেমা
শহিদুল ইসলাম রতন বলেন, জন্মের পর লিমনের শারীরিক ত্রুটি বুঝতে পারিনি। তার বয়স একবছর হওয়ার পরে লিমনের প্রতিবন্ধকতা ধরা পরে। চিকিৎসকের কাছে গিয়েও তখন কোনো লাভ হয়নি। আমার ছেলের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আমার ও স্ত্রীর কোনো কষ্ট নেই। আমার ছেলে আমার কাছে কোনো বোঝা নয়। তাকে খাইয়ে দেওয়া থেকে সবকিছু আমার ও স্ত্রীর করতে হয়। সে চায় উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে পড়াশোনা করতে। আমি মূর্খ মানুষ এরপরও আমার ছেলে প্রতিবন্ধী হয়েও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে বিষয়টি আমার জন্যই গর্বের।
তিনি আরও বলেন, আমার পানের দোকান। দিন শেষে হাতেগোনা কিছু টাকা আয় করি। আমার নিজের কোনো বাড়ি বা সম্পত্তি নেই। আমিতো চিরকাল বেঁচে থাকবো না। তাই চাই আমার ছেলের একটা ব্যবস্থা হোক।
আরও পড়ুন: দারিদ্র্যতা এবং প্রতিবন্ধকতা আটকাতে পারেনি সোহেলকে
লিমনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, হাত খোলা অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না লিমন। এমনকি বসে থাকার মতো শক্তিও পান না। দীর্ঘসময় একটানা হাটতে পারেন না। শারীরিকভাবে ভারসাম্য না পাওয়ায় হাটতে গিয়ে কিছুক্ষণ পর পরই পড়ে যান তিনি। এ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা হতাশ হলেও ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি প্রবল ইচ্ছা ছিল লিমনের। বিষয়টি নজরে আসে তার বাবা-মায়ের। প্রাথমিক সমাপনী, জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষাতে ভালো ফল করে লিমন। স্থানীয় গাবতলী পূর্ব পাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৪.১১ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর ভর্তি হয় বগুড়া সদর উপজেলার গাবতলী তাহেরা পলিটেকনিক ইনিস্টিউটে। সেখান থেকে ২০২২ সালে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন লিমন। এখন ফলাফলের অপেক্ষায় আছেন তিনি।
জেএস/জিকেএস