দেশজুড়ে

ঈশ্বরদীতে এখনো খাজা নাজিমুদ্দিনের নামে বিদ্যালয়

রাষ্ট্রভাষা বাংলার কট্টর বিরোধী ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন। তিনি তার ভাষণে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়’। সেই খাজা নাজিমুদ্দিনের নামে এখনো পাবনার ঈশ্বরদীতে রয়ে গেছে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি নাজিমুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়’।

এ বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের দাবিতে দফায় দফায় প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কাছে দেওয়া হয়েছে স্মারকলিপি। তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে ভাষা আন্দোলনের ৭১ বছরেও বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করা হয়নি। তবে প্রধান ফটক থেকে ‘নাজিমুদ্দিন’ নামটি কালো কালি দিয়ে মুছে দিয়েছে উপজেলা ছাত্রলীগ।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ঈশ্বরদী জিন্নাহ কলেজের নাম পরিবর্তন করে ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ করা হয়েছে। এছাড়া ঈশ্বরদীর একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। অথচ বাংলা ভাষার বিরুদ্ধাচরণ করা সেই খাজা নাজিমুদ্দিনের নামে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি নাজিমুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়’ আজও বহাল তবিয়তে আছে। স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে জন্মেছে ক্ষোভ ও হতাশা।

ঈশ্বরদীর মুক্তিযুদ্ধের গবেষক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে পূর্ব বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলা ভাষার বিরুদ্ধাচরণ করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোরালো বক্তব্য দিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পল্টন ময়দানেও তিনি ‘একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। এরপর সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সভা-সমাবেশের ডাক দেয়।

তিনি বলেন, প্রশাসন ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে একমাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। ১৪৪ ধারা ভেঙেই ছাত্রজনতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিলিত হতে থাকলে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, শফিউরসহ অনেকে শহীদ হন। মূলত খাজা নাজিমুদ্দিনের নির্দেশেই পুলিশ এ হত্যাযজ্ঞ চালায় বলে ধারণা করা হয়। অথচ সেই নাজিমুদ্দিনের নাম গত ৭১ বছর ধরে ঈশ্বরদীবাসী বয়ে বেড়াচ্ছেন।

‘ঈশ্বরদীর ইতিহাস’ বইয়ের লেখক মুক্তিযোদ্ধা কামাল আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নাজিমুদ্দিনের নাম পরিবর্তন করে বিদ্যালয়ের নতুন নামকরণ করা হবে। দেশের অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। কিন্তু এ বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনে সমস্যা কী? তা আমাদের বোধগম্য নয়।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা চান্না মণ্ডল জাগো নিউজকে বলেন, এ বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের জন্য সমাবেশ, মানববন্ধন, স্মারকলিপি দেওয়াসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কিন্তু বারবারই এ দাবি উপেক্ষিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নেয়নি।

তিনি বলেন, নাজিমুদ্দিনের নাম পরিবর্তন করা না হলে মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ মানুষকে নিয়ে আবারও আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।

ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহমান বলেন, এ বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের জন্য ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া আসনের সংসদ সদস্য নুরুজ্জামান বিশ্বাস ও পাকশী বিভাগীয় রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির সদস্য হিসেবে আমি নিজে উপস্থিত থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ বিষয়ে সুপারিশমালা পাঠিয়েছিলাম। এরপর দু-তিন বছর কেটে গেলেও এখনো কিছু জানানো হয়নি।

জানতে চাইলে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) শাহ সূফী নূর মোহাম্মদ বলেন, খাজা নাজিমুদ্দিনের নামে বিদ্যালয়ের নামকরণের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। অল্প কয়েক দিন হলো জেনেছি। বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান রেখে বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এসআর/জেআইএম