দেশজুড়ে

ঈশ্বরদীর শতভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই আছে শহীদ মিনার

মহান ভাষা আন্দোলনের অকুতোভয় সূর্য সন্তানদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ মিনার। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয় শহীদদের স্মরণে নির্মিত এ স্মৃতিস্তম্ভ।

৯০-এর দশকে ঈশ্বরদী পৌর শহরসহ পুরো উপজেলাজুড়ে হাতেগোনা আটটি শহীদ মিনার ছিল। বর্তমানে এ উপজেলার সরকারি ও এমপিওভুক্ত ১৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনায় শোভা পাচ্ছে সুদৃশ্য ও নান্দনিক ডিজাইনের শহীদ মিনার। এছাড়া বেশকিছু নন-এমপিওভুক্ত কলেজ, বেসরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলেও নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ মিনার। সবমিলিয়ে এ উপজেলায় প্রায় দুই শতাধিক শহীদ মিনার রয়েছে।

উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটিতে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ মিনার। এছাড়া সরকারি ও এমপিওভুক্ত মিলিয়ে ৪৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৮টি মাদরাসা ও সাতটি কলেজের প্রতিটিতে শহীদ মিনার রয়েছে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা কলেজ রয়েছে সেখানে মোটের ওপর একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষা অনুরাগীদের সহযোগিতায় এসব শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়।

পৌর শহরের আলহাজ টেক্সটাইল মিলস উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন বললো, প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে স্কুলের শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে আমরা ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে শিক্ষকরা শহীদ মিনারের সামনে আলোচনা সভার আয়োজন করেন। এতে আমরা ভাষা আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সম্পর্কে জানতে পারি।

সে আরও বললো, প্রাথমিক বিদ্যালয়েও এখন শহীদ মিনার রয়েছে। আমাদের সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার থাকলে আমার তখনই ভাষা আন্দোলন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ মিনার সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারতাম।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি পাবনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও ঈশ্বরদী সাউথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হেলাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের উপজেলার শতভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার রয়েছে সেজন্য আমরা গর্বিত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকে ভাষা আন্দোলন, শহীদ মিনার ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার দেখে শিশু শিক্ষার্থীদের মাঝে ৫২’র ভাষা আন্দোলন ও মাতৃভাষা দিবস সম্পর্কে চেতনাবোধ জাগ্রত হয়। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই এদেশে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে সেটিও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সহজেই উপলব্ধি করাতে সক্ষম হন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, এ উপজেলার ১০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটিতেই শহীদ মিনার রয়েছে। এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবন নির্মাণ কাজ চলমান থাকায় শহীদ মিনারের স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ কাজ শেষ হলেই যথারীতি পুনরায় শহীদ মিনার নির্মাণ করা হবে। তাছাড়া যেসব স্থানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় একত্রে রয়েছে সেখানে একটি শহীদ মিনার করা হয়েছে। এটি শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী করা হয়েছে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সেলিম আক্তার জানান, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উপজেলার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়। সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা শহীদ মিনার নির্মাণে সহযোগিতা করেন। উপজেলার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকায় যথাযোগ্য মর্যাদায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করা হয়।

ঈশ্বরদীর বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ঈশ্বরদীর প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার রয়েছে এটি আমাদের জন্য গর্বের ও অহংকারের। ভাষা আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূতিকাগার। ৫২’র আন্দোলনের পথ ধরেই পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধে এদেশের মুক্তিকামী দামাল ছেলেরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল। তাই প্রতিটি শিশু শিক্ষার্থীকে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে জানান দিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ আবশ্যক।

তিনি আরও বলেন, ঈশ্বরদীর প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণের পেছনে দুটি মানুষের অবদান রয়েছে। তাদের একজন সাবেক ভূমিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ভাষা সৈনিক প্রয়াত শামসুর রহমান শরীফ ডিলু এবং তৎকালীন জেলা প্রশাসক রেখা রাণী বালো। তাদের সার্বিক সহযোগিতায় ২০১৭-১৮ সালে এসব শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়।

এমআরআর/এসআর/জেআইএম