জাতীয়

পারিবারিক জীবনযাপনে অর্থ সংকট থাকে নারীর, সইতে হয় নির্যাতন

 

বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৮ কোটি ১৭ লাখ ১২ হাজার ৮২৪ ও নারী ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৪৭ হাজার ২০৬। পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা ১৬ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮২ জন বেশি। অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকারও বেশি এই নারী। বিয়ের আগে-পরে বাবার বাড়ি ও বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়িতেও সব দিক দিয়ে বঞ্চিত তারা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ এবং ‘ভায়োলেন্স এগেইনেস্ট উইমেন’ শীর্ষক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বিবিএস প্রতিবেদন বলছে, পারিবারিকভাবে জীবনযাপন ব্যয়ে নারীকে পর্যাপ্ত টাকা দেওয়া হয় না। প্রয়োজনের তুলনায় দেওয়া হয় নামমাত্র টাকা। বিবাহিত নারীকে শর্ত দেওয়া হয় বিয়ের পর বাবা-মায়ের বাড়ি থেকে টাকা আনতে হবে। যৌতুক প্রথার কারণে নারীরা অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। স্বামী অনেক সময় অর্থসহ নানান ধরনের পণ্য চেয়ে বসে নারীর কাছ থেকে। তখন নারীরা বাধ্য হয়ে বাবাকে টাকার জন্য চাপ দেন। এটাও এক ধরনের অর্থনৈতিক নির্যাতন। আরও পড়ুন>> বছরের প্রথম মাসে নির্যাতনের শিকার ২৪০ নারী-শিশু

পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর জাগো নিউজকে বলেন, ‘নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই। তাদের সামাজিক ও পারিবারিকভাবে আমরা বেঁধে ফেলেছি। নারীদের চাকরি করতে দেয় না, তাদের কাজই যেন সন্তান জন্ম দেওয়া। এই মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া ব্যক্তি স্বাধীনতা হয় না।’

‘পরিবারে নারীকে বন্দি করে রাখা হয়। ধর্মীয়ভাবে নারীদের সম্পদ কম দেওয়া হয়, যেটুকু দেওয়া হয় পারিবারিকভাবেও কম দেওয়া হয়। এখানে নারীরা ভয়াবহভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্বামীর ঘরেও নারী অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত হন। বাবা-মা ছাড়া তাদের প্রতিকারের উপায় থাকে না। বাবা-মা চিরকাল থাকে না। নারীকে আর্থিকভাবে স্বাধীনতা দিতে হবে। তাদের কর্মক্ষেত্রে আনতে হবে। নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলতে হবে।’

আরও পড়ুন>> ব্র্যাকের গবেষণা/দেশে নির্যাতিত নারী-শিশুর ন্যায়বিচার পাওয়ার হার কম 

বিবিএসের পরিসংখ্যান বলছে, এক দশকে দেশে জনসংখ্যা বেড়েছে দুই কোটি ১১ লাখ ১৪ হাজার ৯১৯। বর্তমানে (২০২২) দেশে মোট নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৪৭ হাজার ২০৬, ২০১১ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ২১ লাখ ৯ হাজার ৭৯৬। ফলে গত ১১ বছরে দেশে নারীর সংখ্যা বেড়েছে ১ কোটি ১৪ লাখ ১৩ হাজার ৩০৫ জন। গ্রামে বসবাস করেন ৫ কোটি ৭৮ লাখ ৯০ হাজার ৪৬২ এবং শহরে বসবাস করেন ২ কোটি ৫৪ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪৪ নারী।

বেড়েছে নারীশিক্ষার হারদেশে বর্তমানে ৭২ দশমিক ৮২ শতাংশ নারী শিক্ষিত, যেখানে পুরুষের শিক্ষার হার ৭৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ৪৫ দশমিক ৫৩ জন নারীর হাতে মোবাইল ফোন। ৬৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ পুরুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। ২৩ দশমিক ৫২ শতাংশ নারী ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। অন্যদিকে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন ৩৮ দশমিক ০২ শতাংশ পুরুষ।

আরও পড়ুন>> নারীর প্রতি সহিংসতার ধরন-মাত্রা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে 

জীবনে একবার হলেও নির্যাতনের শিকার ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ নারীজীবনে একবার হলেও শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দেশের ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ নারী। গ্রামে এর হার ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শহরে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ। সিটি করপোরেশন এলাকায় নারী নিপীড়নের হার ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশনের বাইরে জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে এর হার ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত সবশেষ ‘জেন্ডার স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর এ জরিপে সারাদেশে ১৯ হাজার ৯৮৭ জন নারী অংশ নেন। জরিপের প্রতিবেদনে জানানো হয়, জীবনে অন্তত একবার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৯ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। তবে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৫-২৯ বছর বয়সী নারী, যা শতাংশের হিসাবে ৫১ দশমিক ১ শতাংশ। বয়সের অনুপাতে ১৫-১৯ বছর বয়সী নারীদের নির্যাতনের মাত্রা কিছুটা কম, এর হার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। গ্রামে শারীরিক নির্যাতনের হার ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শহরে ৪২ দশমিক ২ শতাংশ।

এতে আরও উঠে এসেছে, জীবনে অন্তত একবার যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ নারী। বয়সের অনুপাতে ২০-২৪ বছর বয়সী ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ১৫-১৯ বছর বয়সী নারী তুলনামূলকভাবে কম যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জরিপে অংশগ্রহণকারী বিবাহিত নারীদের ৫০ শতাংশ স্বামীর দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

৮৫ শতাংশ পরিবারে খানাপ্রধান পুরুষদেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ৮২ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ আট কোটি ৪২ লাখ। নারী আট কোটি ৪০ লাখ। দেশে খানার (এক পাতিলে রান্না করা খাবার খান যারা) গড় আকার ৪ দশমিক ৩ জন। ৮৫ শতাংশ পরিবারের খানাপ্রধান পুরুষ। বাকি ১৫ শতাংশ পরিবারের খানাপ্রধান নারী। দুই হাজার ১২টি নমুনা এলাকা থেকে সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিবিএস এ প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে তিন লাখ ১১ হাজার ৩১টি খানা বা পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। বিবিএসের সবশেষ ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস-২০২০’ শীর্ষক এক জরিপে এ তথ্য উঠে আসে। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের নারীরা এখনো পুরুষের দ্বারা উচ্চমাত্রায় নিয়ন্ত্রিত।

নারীদের হালনাগাদ তথ্য নেই বিবিএসে

নারী ও শিশু নিয়ে বিবিএস ১৪টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সবগুলো ২০১৫ সালের আগে প্রকাশিত। ফলে নারী সংক্রান্ত হালনাগাদ কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি বিবিএস। তবে জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রকল্পে নারীদের নিয়ে সংখ্যাগত কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। করোনা সংকটের কারণে নারীদের নির্যাতন সংক্রান্ত তথ্য প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্ব হয়েছে।

বিবিএস মহাপরিচালক মো. মতিয়ার রহমান জাগো নিউজকে বলেন, পাঁচ বছর পর ‘ভায়োলেন্স এগেইনেস্ট উইমেন’ রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। কিন্তু করোনা সংকটের কারণে আমরা এ কাজ করতে পারিনি। তবে আমাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুত সময়ে আমরা মাঠে নামতে পারবো। পেপার ওয়ার্কিং চলছে।’

এমওএস/এএসএ/এমএস