মতামত

ইবাদতে জেগে থাকুক অন্তরাত্মা

আল্লাহতায়ালার কৃপায় আজ পবিত্র মাহে রমজানের নাজাতের দশকের ৪র্থ দিনের রোজা আমরা অতিবাহিত করছি, আলহামদুলিল্লাহ। অনেকেই শেষের এ দিনগুলোতে রোজার ইবাদতের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে কেনাকাটা নিয়ে ব্যস্ত। আধ্যাত্মিক খাদ্য গ্রহণের পরিবর্তে বাহ্যিক খাদ্যের দিকেই যেন আমাদের আগ্রহ বেশি।

অথচ মুমিনের পরিবারের জন্য পবিত্র এ মাস বসন্তের মাস। এ মাসে প্রতিটি মুমিন হৃদয় যেমন লাভ করে আল্লাহপাকের জান্নাতের প্রশান্তি তেমনি তাদের পুরো পরিবারও হয়ে ওঠে জান্নাতি পরিবার। আমরা যদি আমাদের পরিবারগুলোকে জান্নাত সদৃশ বানাতে চাই তাহলে পবিত্র এ রমজান থেকে লাভবান হতে হবে। রমজানের পবিত্র শিক্ষা বছর জুড়ে জীবিত রাখতে হবে।

নাজাতের এদিনগুলোতে আমাদের ইবাদতে আনতে হবে বিশেষ পরিবর্তন। রাতগুলো নফল ইবাদতে অতিবাহিত করতে হবে। মূলত নিশী রাত্রে জেগে নামাজ, দোয়া ইত্যাদি আত্মশুদ্ধির কাজ করলে কুপ্রবৃত্তিসমূহ দমন হয় এবং নিজের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকরীভাবে সাহায্য করে।

আল্লাহর পবিত্র বান্দাদের সবার এই একই অভিজ্ঞতা যে, আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য গভীর রাতের দোয়া ও নামাজের মত এত কার্যকরী পন্থা আর কোনোকিছু নাই। কেননা গভীর রাতের নীরবতায় হৃদয়ের মাঝে এক প্রশান্তি বিরাজ করে। এছাড়া তাহাজ্জুদের সময়টা ব্যক্তির চারিত্রিক শক্তি অর্জনের পক্ষে এবং নিজের কথাবার্তায় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে অনেক উপযোগী।

মহানবী (সা.) অন্যান্য সময়েও সাধারণত তাহাজ্জুদ নামাজ পরিত্যাগ করতেন না। কিন্তু রমজানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ নামাজ হলো তাহাজ্জুদ।’ (মুসলিম)

অপর এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহতায়ালা বলেছেন, আমি যা কিছু আমার বান্দার ওপর ফরজ করেছি, শুধু তা দ্বারাই কেউ আমার নৈকট্য লাভ করবে না। বরং আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকবে। এমনকি একপর্যায়ে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নিই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। (এমতাবস্থায়) সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, তবে অবশ্যই তাকে তা দান করি। (বুখারি)

রমজানে শুধু নিজে আল্লাহপাকের আদেশ পালন করলাম আর অন্যরা পালন করলো না তা হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক বলেন, ‘হে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে আগুন থেকে বাঁচাও।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৬)

তাই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য সে যেন কেবল নিজেই মুত্তাকি না হয় বরং সে নিজে এবং পরিবারের সকলকে পুণ্যবান-মুত্তাকি করে গড়ে তোলে। সব ধরনের পাপ ও খারাপ থেকে বাঁচাবার জন্য তাদেরকে সঠিকভাবে শিক্ষা দেয়। আমরা যদি সন্তানদেরকে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষায় লালিত-পালিত করি তাহলে পরিবার, সমাজ, জাতি, দেশ সর্বত্রই শান্তি বিরাজ করবে এটা নিশ্চিত। সন্তানদের যদি আমরা উত্তম শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলি তাহলে এদেশে থাকবে না কোনো সন্ত্রাসী, থাকবে না কোনো চোর-ডাকাত, হতে পারে না কোনো মারামারি আর কাটাকাটি। এক কথায় বলা যায় সকল প্রকার অরাজকতা থেকে আমরা মুক্তি পেতে পারি। আর এ জন্যই ঘরকেই বলা হয়েছে শিক্ষার সূতিকাঘর। আমরা যদি আমাদের সন্তানদের প্রতি দৃষ্টি না দেই তাহলে খোদাতায়ালার কাছে আমরা অবশ্যই এর জন্য জিজ্ঞাসিত হব।

আর রমজান মাস হচ্ছে প্রশিক্ষণের মাস। এ মাসে সন্তানদের যদি সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া যায় তাহলে সন্তানরা কখনই ভুল পথে পা রাখবে না। আমরা যদি আল্লাহপাকের আদেশ নিষেধ পরিপূর্ণভাবে প্রথমে নিজেরা পালন করে জীবন অতিবাহিত করি এবং সন্তানদের সেভাবে গড়ে তুলি তাহলে আমাদের ঘর জান্নাতি ঘরে পরিণত হতে পারে। নিজেদের পরিবারগুলোকে জান্নাতি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করাতে চাইলে পবিত্র রমজান মাসকে কাজে লাগাতে হবে।

নাজাতের এ দিনগুলোতে আমাদের অনেক বেশি পবিত্র কুরআন পাঠ ও অন্যান্য ইবাদতে রত হতে হবে। এই দিনগুলোকে শুধু কুরআন তেলাওয়াত নয় বরং এর মর্মার্থ অনুধাবনেরও চেষ্টা করতে হবে। মহানবী (সা.) রমজান মাসে অনেক বেশি কুরআন পাঠ করতেন। হজরত জিবরাইল (আ.) থেকে কুরআনের পাঠ গ্রহণ করতেন। হাদিসে আছে, ‘রমজানের প্রতি রাতে জিবরাইল (আ.) রাসুল (সা.)এর সাথে সাক্ষাত করতেন। কুরআন শুনিয়ে ও শুনে তারপর বিদায় গ্রহণ করতেন।’ (বুখারি)

তাই আসুন না, রমজানের অবশিষ্ট দিনগুলোর প্রতিটি সময়কে কাজে লাগিয়ে বিশেষ ইবাদত বন্দেগিতে রত থেকে অতিবাহিত করি। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে ক্ষমা করে তাঁর সন্তুষ্টির চাদরে জড়িয়ে নিন, আমিন।

লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।

এইচআর/জেআইএম