প্রতিষ্ঠার ১৪ বছর পর মূল সনদ পেতে যাচ্ছেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থীরা। এরইমধ্যে মূল সনদ দেওয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে শিক্ষার্থীরা।
আগামী সপ্তাহ থেকে শিক্ষার্থীরা মূল সনদ পাবেন বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক বিশ্বস্তসূত্র। এর ফলে মূল সনদ না থাকায় উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের জটিলতার অবসান ঘটবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯টি ব্যাচে স্নাতকোত্তর এবং ১০টি ব্যাচে স্নাতক শেষ করেছেন প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী। গ্র্যাজুয়েট হয়েও মূল সনদপত্র ছাড়াই ক্যাম্পাস ছাড়তে হয় তাদের। অনেককে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। সাময়িক সনদপত্র নিয়েই ক্যাম্পাস ছেড়েছেন শিক্ষার্থীরা। বারবার মূল সনদ দেওয়ার দাবি উঠলেও আমলে নেননি সাবেক কোনো উপাচার্য।
তবে, বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশীদ দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষার্থীদের মূল সনদ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এরইমধ্যে সব প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এমন উদ্যোগের ফলে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণে মূল সনদ না থাকার যে বড় বাধা ছিল তার অবসান ঘটবে। শুধু তাই নয়, বর্তমান উপাচার্য যোগদানের এক বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট নামে দীর্ঘ ১৪ বছরের যে অভিশাপ তা নিরসন হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করতে পেরে শিক্ষার্থীদের মাঝে ফিরেছে স্বস্তি।
মূল সনদ পাওয়ার খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা জানান, উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য বাইরের যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমেই যে ডকুমেন্টকে প্রাধান্য দেয় তা হলো মূল সনদ। যা ব্যতীত বাইরের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অনেক শিক্ষার্থী আছেন যারা উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে যেতে চান এবং সুযোগও আসে কিন্তু এতদিন মূল সনদের অভাবে সম্ভব হতো না। উচ্চশিক্ষা গ্রহণে অনেক শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মূল সনদ দেওয়ার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। মূল সনদ শুধু উচ্চশিক্ষা নয়, বরং বিভিন্ন চাকরির মৌখিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের সহায়ক হবে বলে জানান তারা।
জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী এশা শারমিন হক বলেন, ইতালির দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু মূল সনদের পরিবর্তে সাময়িক সনদ দেওয়ায় তারা আমার ভর্তিকে শর্ত সাপেক্ষে ভর্তি হিসেবে যুক্ত করেছে। আমাকে ভিসা অ্যাপ্লিকেশনের আগে মূল সনদ দিয়ে ভার্সিটি থেকে ক্লিয়ারেন্স নিতে হতো যা এতদিন আমার জন্য অনেক বড় দুশ্চিন্তার বিষয় ছিল। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের মূল সনদ দেওয়ার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে তাই আমি এবং আমার মতো অনেকেই এই উদ্যোগের সুফল পাবে। এজন্য আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।
উচ্চশিক্ষায় বিদেশে যেতে আগ্রহী ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হাশেম বাঁধন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মূল সনদ দেওয়ার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এতে করে আমাদের ক্যাম্পাসের বহু শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক বড় সংকটের সমাধান হবে। আগামী সেশনে আমারও বাইরে উচ্চশিক্ষার জন্য অফার লেটার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে মূল সনদ নিয়ে আমিও অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এমন খবরে কিছুটা স্বস্তিবোধ করছি। শিক্ষার্থীবান্ধব এমন উদ্যোগ গ্রহণ করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণেচ্ছুদের সহায়তা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ধন্যবাদ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ারুল আজিম জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমান প্রশাসন শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় যেমন কাজ করে যাচ্ছে তেমনি এরই ধারাবাহিকতায় এই বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। উপাচার্য বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তার কাছ থেকে জানতে পেরেছি এই বিষয়টি অতি দ্রুত, হয়তো এই মাসের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে। আমরা চাই না, মূল সনদ অপ্রাপ্তিতে আমাদের কোনো শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হোক।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশীদ জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের সমস্যার কথা আমাকে জানিয়েছে। তাদের সুবিধার্থে আমি এই পদক্ষেপ নিয়েছি। আশা করছি, সপ্তাখানেক পর থেকেই শিক্ষার্থীদের মূল সনদ দেওয়া শুরু হবে। এটি তাদের উচ্চশিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে এটি রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় নামে যাত্রা শুরু করলেও ২০০৯ সালে বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটির উদ্বোধন করেন।
এমআরআর/এএসএম