যশোর-মাগুরা মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসের চাপায় নিহত সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই একই পরিবারের সদস্য। এ দুর্ঘটনায় নানি, খালা ও খালাতো বোনসহ দুই যমজ ভাইকে হারিয়েছে শিশু খাদিজা। আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন তার মাও।
তবে এ দুর্ঘটনায় আহত হলেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছে খাদিজা। সে এখন যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
শনিবার (৮ জুলাই) দুপুরে হাসপাতালের মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে দেখা গেছে, আহত শিশু খাদিজা বেডে চাচার কোলে বসে আছে। তার শরীরের ক্ষত ধীরে ধীরে সেরে উঠছে। তবে ছোট্ট শিশুটি এখনো জানে না, সেই ভয়াল দুর্ঘটনা চিরতরে কেড়ে নিয়েছে তার আপনজনদের।
স্বজনরা তাকে বলছেন, সবাই ভালো আছে, দু-একদিন পরই দেখা হবে। এই মিথ্যা সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কেঁপে উঠছে তাদের কণ্ঠস্বর। ছোট্ট মেয়েটিকে মর্মান্তিক খবর দেওয়ার সাহস করে উঠতে পারছেন না কেউ।
শুক্রবার সন্ধ্যায় যশোর সদর উপজেলার তেঁতুলতলা বাজারে একটি বাস খাদিজাদের বহনকারী ইজিবাইককে চাপা দেয়। ইজিবাইকটিতে চালকসহ ৯ জন ছিলেন। এতে চালকসহ মারা যান সাতজন। ভাগ্যক্রমে শিশু খাদিজা বেঁচে গেলেও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন মা সোনিয়া খাতুন। ঢাকা মেডিকেলে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন তিনি।
দুর্ঘটনার পর অজ্ঞান অবস্থায় স্থানীয়রা খাদিজাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। তবে বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এদিকে, এ ঘটনায় নিহত সাতজনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
হাসপাতালের বেডে চাচা রনি হোসেনের কোলে বসে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে ছিল অবুঝ শিশু খাদিজা। তাকে জিজ্ঞেস করতেই আধো আধো স্বরে বলে উঠলো, ভালো আছি। তোমার কী হয়েছে, এমন প্রশ্ন করতে সে বলে দিলো, আমাদের গাড়িতে বাস ধাক্কা দিয়েছে। আমি পড়ে গিয়েছিলাম। পড়ে গিয়ে কান্না করছিলাম। তার পর কী হয়েছে সেটা আর বলতে পারেনি সে। মুখ ঘুরিয়ে পেছন দিকে তাকিয়ে থাকলো সে।
খাদিজার চাচা রনি হোসেন বলেন, খাদিজার গলায় টিউমার ছিল। সেটি অপারেশনের জন্য শুক্রবার বিকেলে তারা বাড়ি থেকে ইজিবাইকে যশোরের একটি ক্লিনিকে যাচ্ছিল। পথে লেবুতলা এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা বেপরোয়া একটি বাস তাদের চাপা দিয়ে কিছু দূর সামনে নিয়ে যায়। এতে আমাদের পরিবারের পাঁচজন মারা যায়। এর মধ্যে বেঁচে যান খাদিজা আর তার মা সোনিয়া। রাত ৯টার দিকে খাদিজার জ্ঞান ফেরে। তারপরই মায়ের খোঁজ করে। তাকে বলেছি, মা বাইরে আছে। তুমি সুস্থ হও তোমাকে বাড়িতে নিয়ে যাবো। মাঝে মধ্যে ওর ভাইদেরও ডাকছে। বাবাকে বেশি ডাকে না, কারণ তার বাবা তো চাকরির সুবাদে বাইরে থাকে। তাকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কেঁপে উঠছে হৃদয়।
খাদিজার ফুফা জাকিরুল ইসলাম বলেন, মাথায় আঘাত লেগেছে, গাল কেটে গেছে। হাতে ক্যানোলা লাগানো। ফুলে আছে মাথা। গাড়ির ভেতরে খাদিজা আটকে ছিল। পা ছাড়া কিছু বাইরে ছিল না। সবাই তো জানে ও মারা গেছে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তরল খাবার ছাড়া কিছু খেতে পারছে না। ওর মায়ের অবস্থা খুব খারাপ। ঢাকায় চিকিৎসাধীন। ওদের পারিবারিক অবস্থা ভালো নয়। শত অভাবের মাঝেও সাজানো সংসার ছিল ওদের। সেই সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়ক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, এখন শিশুটির শারীরিক অবস্থা অনেকটা ভালো। এ অবস্থায় পরিবারের মৃত্যুর খবরে তার অবস্থার অবনতি হতে পারে। তাই কাউকে বলতে নিষেধ করেছি।
খাদিজা বাঘারপাড়া উপজেলার যাদবপুর গ্রামের হেলাল মুন্সির মেয়ে। হেলাল ঢাকার হেমায়েতপুরে একটি চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার কারখানায় কর্মরত। দুর্ঘটনার খবর শুনে রাতে রওয়ানা দিয়ে ভোরে বাড়ি এসে পৌঁছেছেন। তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে ঢাকায়ই বসবাস করেন। কোরবানির ঈদের আগে সবাই গ্রামে এসেছিলেন। ছুটি শেষে হেলাল হোসেন কর্মস্থলে ফিরে গেলেও স্ত্রী সোনিয়া বেগম যমজ সন্তান হাসান-হোসেন ও মেয়ে খাদিজাকে (৫) নিয়ে বাড়িতে ছিলেন। মেয়ের চিকিৎসা করানোর জন্য ঢাকায় যাননি।
মিলন রহমান/এমআরআর/এমএস