দেশজুড়ে

১৫ বছরেও লাগেনি উন্নয়নের ছোঁয়া, দুর্ভোগ চরমে

নারায়ণগঞ্জের একটি অবহেলিত গ্রাম চর ধলেশ্বরী। গত ১৫ বছরে এ গ্রামে লাগেনি উন্নয়নের ছোঁয়া। নেই ভালো কোনো রাস্তাঘাট। গ্রামের একমাত্র রাস্তায় ১০ বছর আগে ইটের সোলিং থাকলেও এখন আর নেই তার কোনো চিহ্ন। এমনকি নেই বিশুদ্ধ পানির সুবিধাও। তারা পাচ্ছেন না সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা।

চর ধলেশ্বরী গ্রামটি নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কলগাছিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার সময় শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীর মোহনায় জেগে ওঠা একটি চরে এ গ্রামটি গড়ে ওঠে। বর্তমানে এই গ্রামে বাস করেন পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ। গ্রামটি জেলার শেষপ্রান্তে হওয়ায় শুরু থেকেই অবহেলিত এ গ্রামের বাসিন্দারা। যে দলই ক্ষমতায় আসে না কেন, তাদের প্রতিনিধিরা শুধু ভোটের সময়ই এই গ্রামে আসেন। নির্বাচন শেষে তারা উধাও হয়ে যান। এলাকার মানুষ দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তাদের কোনো দেখা পান না।

এই এলাকার মানুষ মূলত গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি লালন-পালন, কৃষিকাজ ও নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। কিন্তু রাস্তা না থাকায় গ্রামের মানুষ তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যসহ যাবতীয় সবকিছু বাজারজাত করতে শহরে নিতে পারছেন না।

আরও পড়ুন: পিলার দেবে ব্রিজে ফাটল, ঝুঁকি জেনেও চলছে ৮ গ্রামের মানুষ

গ্রামে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত একটি মাদরাসা ও স্কুল রয়েছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বর্ষাকালে স্কুল ও মাদরাসায় যেতে দুর্ভোগের সীমা থাকে না। সবাইকে সব কাজেই পোহাতে হয় নানা দুর্ভোগ।

আবেদা নামে এক নারী বলেন, আমরা গরিব মানুষ। চরে থাকি গরু-ছাগল লালন-পালন করেই আমাদের জীবন চলে। আমরা সরকারি কোনো অনুদান বা সুযোগ-সুবিধাই পাই না। অসুস্থ হলে স্বাস্থ্যসেবা পাই না। রাস্তাঘাট নেই। ভোটের সময় এলে অনেকেই অনেক প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ভোটের পর তাদের আর দেখা যায় না। বৃষ্টি হলে রাস্তায় চলতে পারি না। রাস্তায় কোনো লাইট নেই। ভোটের সময় বর্তমান চেয়ারম্যান বলেছিল রাস্তায় লাইট দেবে। বিগত ১৫ বছর ধরেই শুনে আসছি রাস্তা করে দেবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো খবর নেই।

মুন্সিগঞ্জের একটি কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন মাসুম বিল্লাহ আকাশ। তিনি বলেন, আমরা অবহেলিত একটি গ্রামের বাসিন্দা। আমি ছোট থেকেই এই এলাকার কোনো উন্নয়ন দেখিনি। জনপ্রতিনিধিরা সবাই নির্বাচনের পর ব্যস্ত হয়ে যায়। আমাদের কেউ খোঁজ রাখে না। ভোটের সময় এলেই তাদের প্রতিশ্রুতিতে আমরা ভেসে যাই। কিন্তু কাজের বেলায় কিছুই না।

আরও পড়ুন: রাঙ্গামাটিতে হঠাৎ অটোরিকশা বন্ধ, যাত্রীদের ভোগান্তি

তিনি আরও বলেন, আমাদের এলাকায় বিশুদ্ধ পানির অনেক ঘাটতি। কিন্তু সরকারি কোনো নলকূপ নাই। দু-একটা থাকলেও সেগুলো ব্যক্তি উদ্যোগেই হয়েছে। আমাদের একটি রাস্তা খুবই প্রয়োজন। একটি রাস্তা হলে নদী পারাপারের ঝামেলা থাকতো না। বিশেষ করে রাতের বেলায় রাস্তা দিয়ে হাঁটা যায় না অন্ধকারে। অনেকবার বলেছে ল্যাম্পপোস্ট দেবে কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। রাত হলে আমরা ডাকাতের ভয়ে থাকি। প্রায় সময়ই এই এলাকায় ডাকাতি হয়ে থাকে।

দোকানদার বাচ্চু মিয়া বলেন, রাস্তাঘাট, ঘাটলা, বিশুদ্ধ পানি সংকটসহ আমরা নানান সমস্যা নিয়ে বসবাস করছি। স্বাধীনতার পর থেকেই এই এলাকায় তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। কোনো রকম একটা রাস্তা ইট দিয়ে সোলিং করা হয়েছিল। এখন সেই সোলিংও উঠে গেছে। পানির সমস্যার কারণে আমরা গোসল করতে পারি না, অজু করতে পারি না। আমাদের খালের পানি খেতে হয়। দেখার কেউ নেই।

শফিউদ্দিন নামে এক বাসিন্দা বলেন, বৃষ্টি হলে বাসা থেকে বের হতে পারি না। নারায়ণগঞ্জের কোথাও কাঁচা রাস্তা নেই আমাদের গ্রামে কাঁচা রাস্তা আছে। আমাদের মা-বোনেরা হাঁটু পর্যন্ত কাঁদা পানিতে নেমে গোসল করে। এখানে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ বাস করে। একটা ঘাটলা নেই। নির্বাচন এলে চেয়ারম্যান-মেম্বার অনেক প্রতিশ্রুতি দেয় আমাদের সব সমস্যার করবে। নির্বাচনের পরে তাদের আর খবর থাকে না।

তিনি আরও বলেন, রাতের বেলায় রাস্তায় বের হতে পারি না অন্ধকারের কারণে। আমরা কাজ করে খাই। কৃষিকাজ করে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে থাকি। নদীর ওপাড়ে যেতে পারি না, আমাদের নৌকা ভেড়াতে দেয় না। মনে হয় যেন আমরা বাংলাদেশের নাগরিক না। আমরা অসহায়।

কলাগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, আমি জানি ওই এলাকায় নিটপল্লীর প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অনুমতি পেয়েছে। কিন্তু জমি সংক্রান্ত একটি জটিলতার কারণে সেটা হচ্ছে না। যদি সেখানে নিটপল্লী হয় তাহলে গ্রামবাসীকে অন্য কোথাও পুনর্বাসন করতে হবে। এই অবস্থায় সরকারি টাকা খরচ করে উন্নয়ন করা যায় না। তারপরও আমি ওই এলাকার উন্নয়নের বিষয়টি নিয়ে ওপর মহলে কথা বলবো।

আরও পড়ুন: কুড়িগ্রামে বন্যায় ভেসে গেছে ৬৫০ পুকুরের মাছ

বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ রশিদ জাগো নিউজকে বলেন, এলাকার উন্নয়ন কাজের জন্য চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। তারা যদি কাজ না করে তাহলে তো কিছু করার থাকে না। আমি এই বিষয়টি খোঁজ-খবর নিয়ে দেখছি।

বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কুদরত-এ-খুদা জাগো নিউজকে বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আমাকে এই বিষয়টি জানায়নি। আমি এই প্রথম শুনলাম। তবে চর ধলেশ্বরী গ্রামের মানুষের কী কী প্রয়োজন তা যদি আমাকে জানায় তাহলে আমি সেটা পূরণের জন্য চেষ্টা করবো। সেটা অবকাঠামো উন্নয়ন হোক কিংবা অন্য যে কোনো উন্নয়ন হোক আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করবো।

মোবাশ্বির শ্রাবণ/জেএস/এমএস