দেশজুড়ে

রেলস্টেশনে রাত কাটিয়ে ভোর হলেই বিক্রি হন তারা

ফরিদপুরে কৃষিকাজের এখন ভরা মৌসুম। নানা সমস্যা ও সংকটের পাশাপাশি রয়েছে শ্রমিকের বড় অভাব। তবে শ্রমিক সংকটের ঘাটতি অনেকটা পুষিয়েছেন উত্তরবঙ্গের শ্রমিকরা। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় কাজের সন্ধানে উত্তরবঙ্গ থেকে শত শত শ্রমিক দলবেধে এসেছেন ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে। তবে সারাদিন কাজ শেষে রেলস্টেশনে মানবেতর রাত কাটে এসব শ্রমিকদের।

খবর নিয়ে জানা গেছে, বছরের এই সময় উত্তরবঙ্গ তথা রাজশাহী, নাটোর, চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে শত শত শ্রমিক কাজ করতে আসেন বোয়ালমারীতে। রাজশাহী থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া পর্যন্ত চলাচল করে টুঙ্গীপাড়া এক্সপ্রেস নামের আন্তঃনগর ট্রেন। বোয়ালমারী থেকে সকাল সোয়া ৮টায় রাজশাহীর উদ্দেশে ট্রেনটি ছেড়ে যায় আর রাত সাড়ে ৮টায় রাজশাহী থেকে বোয়ালমারী পৌঁছায়।

টুঙ্গীপাড়া এক্সপ্রেসে করে শত শত শ্রমিক কাজের সন্ধানে এই অঞ্চলে চলে আসেন। তাদের সঙ্গে থাকে মশারি আর বিছানাপত্র। রেলস্টেশনেই বিছানা পেতে শুয়ে পড়েন তারা। রেলস্টেশনে কাটে তাদের রাত। ভোর হলেই স্টেশনের পাশের চত্বরে বসে মানুষের হাট। সেখান থেকে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মানুস এসে তাদের দিনমজুর বা টাকায় ঠিক করে কাজের জন্য নিয়ে যান।

সারাদিন কাজ করে আবার চলে আসেন রেলস্টেশনে। রাতে স্টেশনে থাকতে কোনো বাধা না থাকলেও তাদের চরম সমস্যায় পড়তে হয় প্রাকৃতিক কাজ সারতে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রেলস্টেশনের মূল শেডের নিচে টাঙানো প্রায় সারি সারি শতাধিক মশারি। একেকটি মশারির মধ্যে ২ থেকে ৩ জন করে শুয়ে আছেন। কেউবা বসে আছেন। আবার অনেকে গরমের কারণে বাইরেই বসে আছেন। কেউ কেউ ঘোরাফেরা করছেন।

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ভবানিগঞ্জ ইউনিয়নের কুদাপাড়া গ্রাম থেকে আসা শ্রমিক রহিম মন্ডল জাগো নিউজকে বলেন, তিনি এক সপ্তাহ আগে এসেছেন। প্রতিদিন সকালে রেলস্টেশনের পাশের চত্বর থেকে তিনি নগদ টাকায় চুক্তি মূল্যে বিক্রি হয়ে যান। গৃহস্থের বাড়িতে সকাল-দুপুর খাবার খেয়ে রাতে বাজারের হোটেলে খেয়ে স্টেশনে রাত যাপন করেন।

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর গ্রাম থেকে শ্রমিকের কাজ করতে আসা মহিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের উত্তরবঙ্গে এখন কাজের আকাল। তাই ট্রেনে চড়ে ফরিদপুরে এসেছি। প্রতি ৩০ শতাংশ জমি ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা ঠিকা নিয়ে ধান রোপণের কাজ করছি গত এক সপ্তাহ ধরে। উত্তরবঙ্গ থেকে আসা কমপক্ষে শতাধিক শ্রমিক এখানে কাজের জন্য আসে এবং রাতে রেলস্টেশনে ঘুমায়। আরেক শ্রমিক বছির উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, এক সপ্তাহ ধরে এখানে রাত যাপন করছি। প্রতিদিন সকালে বিক্রি হয়ে বিভিন্ন স্থানে কাজ করতে যাই। দিন হিসাবে বিক্রি হলে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, পাশাপাশি দুই বেলা খাবার পাই। আবার পাখি প্রতি ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা ঠিকায়ও ধান রোপণের কাজ করি।

চাপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার পিরপুর সাহানাপাড়া থেকে আসা শ্রমিক আলী কদর বলেন, ধান রোপণ, পাট কাটা, পাটের আঁশ ছাড়ানো-ধোয়া থেকে শুরু করে সবরকম কাজেই তাদের দক্ষতা রয়েছে। এখন ধান রোপনের কাজ বেশি। কেউ এক সপ্তাহ কাজ করে বাড়ি গিয়ে আবার আসে। রাতে এখানে থাকতে খুব সমস্যা না হলেও রাতবিরেতে বাথরুমের চরম সমস্যায় পড়তে হয়।

রেল স্টশনে শ্রমিক নিতে আসা বাবুর বাজার এলাকার জাকারিয়া শেখ জাগো নিউজকে বলেন, এলাকায় কাজের চাপ আছে, রয়েছে শ্রমিক সংকটও। সারাবছর রেলস্টেশন ও হ্যালিপ্যাডে স্থানীয় শ্রমিক পাওয়া যায়। তবে সংখ্যায় কম ও স্থানীয় শ্রমিকদের মজুরি বেশি। আবার দুপুর দেড়টা বাজলেই কাজ ছেড়ে চলে যায়। তাই স্টেশন থেকে উত্তরবঙ্গের শ্রমিক নিতে এসেছি। এরা ঠিকাচুক্তিতে অনেক কাজ করে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ছোলনা গ্রামের বাসিন্দা ও তাজ ট্রেডাসের মালিক মো. মিজানুর রহমান মিজান জাগো নিউজকে বলেন, এসব শ্রমিকরা এলাকার শ্রমিক সংকট দূর করার পাশাপাশি রেলস্টেশন এলাকা সকাল-সন্ধ্যা সরগরম করে রাখেন। এ এলাকার মুদি দোকান, চা দোকান ও বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের বেচা-বিক্রি বেড়েছে।

এ বিষয়ে বোয়ালমারী রেলস্টেশনের বুকিং ইনচার্জ মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, সেই উত্তরবঙ্গ থেকে কষ্ট করে শ্রমিকরা আসেন। যেভাবেই হোক স্টেশনে রাত কাটান। আমাদের কিছু সমস্যা হলেও মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের থাকতে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা চেয়ারম্যান এম এম মোশাররফ হোসেন বলেন, শ্রমিক হলেও তারা মানুষ। তারা আমাদের মেহমানের মতো। তাদের খোঁজ-খবর নেওয়ার পাশাপাশি কোনো সহোযোগিতার প্রয়োজন হলে চেষ্টা করা হবে।

এফএ/এএসএম