দেশজুড়ে

শিল্পাঞ্চলে বাড়ছে ছিনতাই-হামলা, নিরাপত্তাহীনতায় কর্মীরা

হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চল হিসেবে খ্যাত অলিপুর। বড় কয়েকটি শিল্পগ্রুপের কারখানা রয়েছে এখানে। কর্মরত কয়েক হাজার মানুষ। সম্প্রতি অলিপুর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল ঘিরে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হচ্ছেন শ্রমিক-কর্মকর্তারা। কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মোবাইল ফোন-নগদ টাকা। সন্ত্রাসীদের ভয়ে মামলা করতেও সাহস পান না কেউ। এসব ঘটনার পর পুলিশি টহল জোরদার করা হলেও এ এলাকায় কর্মরত কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মকর্তার কাটছে না আতঙ্ক।

Advertisement

সম্প্রতি হামলার শিকার অলিপুরে প্রতিষ্ঠিত একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানান, কয়েকদিন আগে খাওয়া-দাওয়া করে রাতে বাইরে হাঁটছিলেন। রাত পৌনে ১০টার দিকে কয়েকজন যুবক লাঠি দিয়ে তাকে পিটিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মোটরসাইকেলযোগে পালিয়ে যান।

তিনি বলেন, আগে শুনেছি যে এমন হয় মাঝে মধ্যে। কিন্তু আমার সঙ্গে এমনটি হতে পারে তা ধারণায়ও ছিল না।

নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও এক কর্মকর্তা জানান, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় তিনি হাঁটতে বের হন। এসময় মোটরসাইকেলযোগে ছয়জন দুর্বৃত্ত এসে তার পায়ে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। তিনি এসময় চিৎকার দিলেও অস্ত্রের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি।

Advertisement

তিনি বলেন, ‘এদের কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কাউকে চিনিও না। তাছাড়া আমরা বাইরে থেকে এসেছি চাকরি করতে। কার বিরুদ্ধে মামলা করবো। যেহেতু চিনি না, ঝামেলায়ও যেতে চাই না। তাই মামলা করিনি। তবে এখনো হাঁটতে বেশ সমস্যা হচ্ছে।’

আরও পড়ুন• শিল্পায়নের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে শায়েস্তাগঞ্জশায়েস্তাগঞ্জে বেড়েছে চুরি-ছিনতাই, আতঙ্কে নারী শ্রমিকরা

হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের কর্মচারী আফজল জানান, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ভাটি শৈলজুড়া গ্রামের বাসিন্দা মতু মিয়ার ছেলে সাব্বির নামে এক যুবক দলবল নিয়ে ধারালো অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তার ওপর হামলা চালায়। এসময় তারা আফজলের বুক, কান, হাত ও পিঠে বেশ কয়েকটি আঘাত করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। তিনি চিৎকার করলেও কেউ ভয়ে এগিয়ে আসেননি। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

‘সাব্বিরও একই কোম্পানিতে চাকরি করেন। বিভিন্ন সময় কর্মকর্তাসহ অনেকের ওপরই হামলা করেছেন। প্রতিবারই লিখিত দিয়ে চাকরিতে বহাল হন। কিন্তু এরপরও দাঙ্গা-হাঙ্গামা করেই চলেছেন। এ ঘটনায় শায়েস্তাগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেছি।’

Advertisement

হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রধান প্রকল্প কর্মকর্তা দীপক কুমার দেব বলেন, বিভিন্ন সময় এখানে চুরি, ছিনতাই ও শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। একই ধরনের লোক বারবার এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। সম্প্রতি বিষয়টি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থায় শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি জেলা পুলিশ সুপারকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে ডিবি পুলিশকে তদন্তের জন্য দায়িত্ব দেন। তারা মাঠে কাজও করছেন। তাদের হাতে হামলা এবং চুরি, ছিনতাইয়ের প্রমাণ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয় এক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচারণা বেশি বেশি করা প্রয়োজন। এতে পুলিশের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে জনপ্রতিনিধিদের। এটি বেশি সময়ের জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি করবে।

ওই এলাকার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট নাগরিক তোফাজ্জল সোহেল জাগো নিউজকে বলেন, কোনো অপরাধকেই আসলে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা হলো সামাজিক সচেতনতা, মূল্যবোধ বৃদ্ধি এবং সুস্থ চিন্তার চর্চা করতে হবে। এক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিরা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা এলাকায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলায় যুব সমাজকে আকৃষ্ট করতে পারেন। তাদের সামাজিক বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। অভিভাবকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। তাদের খোঁজ রাখতে হবে তার ছেলে কোথায় যাচ্ছে, কী করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। একটি টিমওয়ার্ক দরকার। কারও একার পক্ষেই আসলে অপরাধ দূর করা সম্ভব নয়।

জেলার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণডোরা ইউপি চেয়ারম্যান হুসাইন মো. আদিল (জজ মিয়া) বলেন, আসলে যেখানেই শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠেছে সেখানেই কিছু অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে। সে হিসেবে এখানে অপরাধ অনেক কম। তবে এ অপরাধকে এখনই শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে হবে। না হলে একসময় তা বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়াতে পারে। কম থাকতেই এটির লাগাম টেনে ধরতে হবে।

‘যারাই এসব অপরাধে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো এলাকার মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নেশা দূর না করতে পারলে অপরাধ দূর করা কঠিন। এজন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এলাকাগত প্রভাবের যে মানসিকতা তা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে।’

এ বিষয়ে সদর-লাখাই ও শায়েস্তাগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খলিলুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, এসব ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। আসলে মামলা করা না হলে আমাদের কিছুই করার থাকে না। কেউ যদি মামলা করে তবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চুরি, ছিনতাই, হামলা হবে আর পুলিশ ব্যবস্থা নেবে না তা হতে পারে না।

এএসএ/জেআইএম