ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. কৃষি ও প্রকৃতি

কৃষিজমিতে সীসা দূষণ, মাটির নীরব ঘাতক

সমীরণ বিশ্বাস | প্রকাশিত: ০৩:৪০ পিএম, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সবুজে ঘেরা মাঠ, বাতাসে দুলতে থাকা ফসল আর কৃষকের মুখের প্রশান্ত হাসি, এই চির চেনা দৃশ্যই বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কৃষক তার ঘাম ও শ্রম দিয়ে এই ভূমিকে উর্বর করে তুলেছে, দেশের মানুষের খাদ্য জুগিয়েছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। কিন্তু এই দৃশ্যমান সৌন্দর্যের আড়ালে আজ ক্রমেই ঘনিয়ে উঠছে এক নীরব অথচ ভয়াবহ সংকট। যে মাটিকে কৃষক বিশ্বাস করে বীজ বোনেন, সেই মাটিই এখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে অদৃশ্য বিষের আধারে।

বাংলাদেশের কৃষিজমিতে সীসা দূষণ আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি একটি ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য সংকট। ব্যাটারি রিসাইক্লিং শিল্প, শিল্পবর্জ্য, অনিয়ন্ত্রিত ইটভাটা, দূষিত সেচের পানি, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অব্যবস্থাপনা, সব মিলিয়ে সীসা ধীরে ধীরে মাটিতে জমা হচ্ছে। এই ভারী ধাতু মাটির উর্বরতা নষ্ট করার পাশাপাশি শস্যের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ।

সীসা দূষিত মাটিতে উৎপাদিত ফসল বাহ্যিকভাবে সতেজ ও স্বাস্থ্যকর মনে হলেও ভেতরে বহন করে নীরব বিষ। শিশুদের মেধা বিকাশে বাধা, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, কিডনি ও হৃদরোগের ঝুঁকি, এসবই সীসা দূষণের পরিচিত ফল। ফলে এই সংকট শুধু কৃষির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সাথেও গভীরভাবে জড়িত। আজ তাই প্রশ্ন শুধু ফলন বাড়ানোর নয়, প্রশ্ন হলো নিরাপদ খাদ্য ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার।

মাটির এই নীরব বিষকে উপেক্ষা করলে সবুজ মাঠের হাসি একদিন হারিয়ে যেতে পারে। সময় এসেছে সচেতনতা, গবেষণা ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে মাটিকে রক্ষা করার, কারণ মাটি বাঁচলেই বাঁচবে কৃষক, দেশ ও আগামী প্রজন্ম। বাংলাদেশের মাটিতে সীসা (লিড) দূষণের মাত্রা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা শুধু পরিবেশগত সংকট নয় বরং একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব সংকট হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে।

মাটিতে সীসা: উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা আর্থ–এর সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলের মাটিতে সীসার মাত্রা সর্বোচ্চ ৭০ হাজার পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, মার্কিন পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা মাটিতে সীসার সর্বোচ্চ নিরাপদ সীমা নির্ধারণ করেছে মাত্র ২০০ পিপিএম। অর্থাৎ বাংলাদেশের মাটিতে পাওয়া সীসার মাত্রা আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত মানদণ্ডের প্রায় ৩৫০ গুণ বেশি। এই পরিসংখ্যান নিছক একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি আসন্ন বিপর্যয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত।

সীসা ঢুকছে মানুষের শরীরেও
পরিবেশ দূষণ তখনই সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা সর্বোচ্চ ৪৭ মাইক্রোগ্রাম বা ডেসিলিটার পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এখানে উল্লেখযোগ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন শিশুদের রক্তে সীসার গ্রহণযোগ্য সীমা নির্ধারণ করেছে মাত্র ৩.৫ মাইক্রোগ্রাম বা ডেসিলিটার। অর্থাৎ কিছু শিশুর রক্তে সীসার পরিমাণ নিরাপদ সীমার প্রায় ১৩ গুণেরও বেশি। এই মাত্রা শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ।

সীসা কেন এত ভয়ংকর
সীসা কোনো সাধারণ দূষক নয়। এটি একটি নিউরোটক্সিন, যা ধীরে ধীরে মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সীসার প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ। সীসা দূষণের ফলে শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা স্থায়ীভাবে কমে যেতে পারে। মনোযোগের ঘাটতি, আচরণগত সমস্যা ও শেখার অক্ষমতা দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদে কিডনি, হৃদরোগ ও হরমোনজনিত জটিলতা তৈরি হয়। সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, সীসার ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রে অপ্রত্যাবর্তনযোগ্য। একবার ক্ষতি হয়ে গেলে তা আর পূরণ করা যায় না।

কৃষি ও খাদ্য শৃঙ্খলে সীসার অনুপ্রবেশ
বাংলাদেশের কৃষি প্রধানত মাটিনির্ভর। যখন সেই মাটিতে অতিমাত্রায় সীসা জমা হয়, তখন তা সরাসরি ফসলের মধ্যে প্রবেশ করে। শাক-সবজি, ধান, গমসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্যের মাধ্যমে এই ভারী ধাতু মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ে। ফলে তৈরি হচ্ছে এক বিষাক্ত খাদ্য চক্র মাটি → ফসল → খাদ্য → মানুষ। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা শুধু পরিমাণের দিক থেকে নয়, নিরাপত্তা ও গুণগত দিক থেকেও হুমকির মুখে পড়বে।

সীসা দূষণের প্রধান উৎস
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সীসা দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস হলো অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিসাইক্লিং শিল্প। ব্যবহৃত লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি থেকে সীসা সংগ্রহের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অননুমোদিত কারখানা। এসব কারখানায়, কোনো পরিবেশগত নিরাপত্তা মানদণ্ড মানা হয় না। বর্জ্য সরাসরি মাটি ও পানিতে ফেলা হয়। শ্রমিক ও আশপাশের মানুষ সরাসরি বিষের সংস্পর্শে আসে। এ প্রক্রিয়ায় সীসা ধীরে ধীরে মাটিতে জমে, ছড়িয়ে পড়ে কৃষিজমিতে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

আগামী ১০ বছরের ভয়াবহ সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি আগামী ১০ বছরের মধ্যে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে সীসা দূষণ বাংলাদেশে মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। এটি তখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা থাকবে না, জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করবে। শিশুদের একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয়
এখনই পদক্ষেপ না নিলে দেরি হয়ে যাবে। এ ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং সম্পূর্ণ বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণ। বৈধ রিসাইক্লিং কারখানায় কঠোর পরিবেশ মানদণ্ড প্রয়োগ। সীসা দূষিত এলাকার মাটি ও ফসলের নিয়মিত পরীক্ষা। শিশুদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে লিড স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম। কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা ও নিরাপদ কৃষি চর্চা প্রসার। শক্তিশালী আইন প্রয়োগ ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান গঠন।

বাংলাদেশের মাটি শুধু কৃষকের জীবিকা নয়, এটি জাতির ভবিষ্যতের ভিত্তি। সেই মাটি যদি বিষে ভরে যায়, তবে ফসলের হাসি একদিন অশ্রুতে পরিণত হতে বাধ্য। সীসা দূষণ কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়, এটি এখনই আমাদের চারপাশে, আমাদের মাটিতে, আমাদের সন্তানের রক্তে। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। এখনই সময়, মাটিকে বাঁচানোর, মানুষকে বাঁচানোর, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করার।

এসইউ

আরও পড়ুন