৬৭৫ শিক্ষক শূন্যতায় ইবি, নিয়োগে অনুমোদন মিলছে না ইউজিসির
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক/ফাইল ছবি
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেড় বছরেরও বেশি সময় মেয়াদ পার করেছে বর্তমান প্রশাসন। তবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) শিক্ষক সংকট নিরসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। ৬৭৫ জন শিক্ষক প্রয়োজন থাকলেও এসময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মাত্র ছয়জন। ফলে অন্তত ১৪টি বিভাগে তীব্র শিক্ষক সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা, বাড়ছে সেশনজট।
স্থায়ী শিক্ষকের অভাবে একাধিক বিভাগে অন্যান্য বিভাগ থেকে ধার করা শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালাতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার মান ও শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ বাড়ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ৩৬টি বিভাগের মধ্যে অন্তত ১৪টি বিভাগ তীব্র শিক্ষক সংকটে ভুগছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম চলমান থাকলেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সে তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। সবশেষ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ফোকলোর স্টাডিজ, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ এবং ল’ অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে একজন করে শিক্ষক নিয়োগ দেয়। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এসব নিয়োগ নিতান্তই অপ্রতুল এবং এতে শিক্ষক সংকট নিরসন সম্ভব নয় বলে অভিযোগ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের।
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ এবং ইসলামিক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চে একটি করে শূন্যপদের বিপরীতে নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় থেমে রয়েছে নিয়োগ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, চারুকলা বিভাগে পাঁচজন, সমাজকল্যাণ বিভাগে চারজন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে পাঁচজন, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে চারজন, ফোকলোর স্টাডিজ বিভাগে পাঁচজন, ল’ অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে পাঁচজন, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগে চারজন, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে পাঁচজন, শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগে দুজন, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পাঁচজন, ফার্মেসি বিভাগে ছয়জন, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগে তিনজন, মার্কেটিং বিভাগে পাঁচজন এবং এনভায়রনসেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড জিওগ্রাফি বিভাগে মাত্র চারজন শিক্ষক রয়েছেন।
প্রতিটি বিভাগে ৬-৭টি ব্যাচ রয়েছে। তীব্র শিক্ষক সংকটে বিভাগীয় কার্যক্রম সচল রাখতে বাধ্য হয়ে অন্যান্য বিভাগের শিক্ষকদের ধার নিতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানালেও কার্যত কোনো সুরাহা মেলেনি। শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর মানববন্ধন করেন চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এরআগে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাতটি বিভাগে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করেন শিক্ষকরা।
রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রশাসন ২১টি বিভাগে মোট ৫৯ জন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে আবেদন করেন প্রার্থীরা। তবে এসব নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইউজিসির অর্থছাড়ের পূর্বানুমতি না নেওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। পরে ইউজিসি শিক্ষক সংকট বিবেচনায় ছয়টি বিভাগে মাত্র ছয়টি পদে অর্থছাড় অনুমোদন দিলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
সবশেষ নতুন করে ১৪টি বিভাগসহ দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পদসহ মোট ২৮ পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এই পদগুলো দ্রুত পূরণ করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফ হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকটে আমাদের বিভাগে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কয়েকজন শিক্ষককে অতিরিক্ত কোর্স পড়াতে হচ্ছে। ফলে পাঠদানের মানও ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে সেশনজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের কাছে বারবার দাবি জানালেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। দ্রুত পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ না হলে আমাদের একাডেমিক জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
বিভাগীয় সভাপতিদের অভিযোগ, প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাব ও অব্যবস্থাপনায় শিক্ষক সংকট নিরসন হচ্ছে না। একাডেমিক অচলাবস্থা ও সেশনজট কাটাতে অতিদ্রুত পর্যাপ্ত শিক্ষকের দাবি জানান তারা।
এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড জিওগ্রাফি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইনজামুল হক সজল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের বিভাগের সমমনা কোনো বিভাগ নেই। তবুও গত আট বছরে কোনো শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। আমাদের বিভাগে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫০ জন। অথচ শিক্ষক আছে প্রতি ৬২ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি) সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে এক হাজার ৮০ জন শিক্ষকের প্রয়োজন থাকলেও মাত্র ৪০৫ জন শিক্ষক রয়েছে। অর্থাৎ ৬৭৫টি শিক্ষক পদই ঘাটতি। এ অবস্থায় বিভিন্ন বিভাগে মাত্র দু-তিনজন শিক্ষক দিয়ে পড়ানো হচ্ছে। এটি ইউজিসির ক্লাস লোড পলিসির পরিপন্থি।
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইউজিসি থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে আর্থিক অনুমোদনের বিষয়গুলো ইউজিসিতেই আটকে থাকছে। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। বর্তমানে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি কার্যকর রয়েছে। প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফয়েজের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পরে ইউজিসির সদস্য (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজিম উদ্দিন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
ইরফান উল্লাহ/এসআর/এমএস