বৈশাখ নিয়ে রাবিতে চলছে আগাম প্রস্তুতি
এসো হে বৈশাখ/ এসো, এসো/ তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরে আবর্জনা দূর হয়ে যাক/ যাক পুরাতন স্মৃতি। এই গীতি বাঙালি জাতির ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখের আগমন নিয়ে কয়েকটা কথা। লিখেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কথাগুলো ছোটো ছেটো হলেও ছুঁয়ে যায় প্রাণ।
তবে সময় অনেক বদলেছে। দিনে দিনে এই প্রাণের পহেলা বৈশাখ পালন রূপ নিয়েছে নানা ধরনে। এক একটা দিন যাচ্ছে আর নতুনত্ব আসছে সব কিছুর। যে পহেলা বৈশাখ এক সময় কেবলই ছিলো কৃষি নির্ভর, সে দিনটি আজ রূপ নিয়েছে অন্য রকম উৎসবে। শুধু কৃষি নির্ভর গ্রাম-বাংলা নয় এর শোভা এখন ছড়িয়ে গেছে নগরের ইট পাথরের প্রতিটি কণায় কণায়।
সারা দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবারও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চলছে নানা আয়োজন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মূল আকর্ষণ হলো চারুকলা বিভাগ। চারুকলা বিভাগ থেকে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাস্থানীয় ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে মূল শোভাযাত্রা বের করা হয়। প্রতিবারের ন্যায় পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে কেন্দ্র করে চারুকলা বিভাগে চলছে নানা প্রস্তুতি। শিক্ষার্থীরা শোভাযাত্রার জন্য তৈরি করতে শুরু করেছেন প্ল্যাকার্ড, মুখোশসহ বিভিন্ন ধরনের কৃষি সম্পর্কিত লোকজ যন্ত্রপাতি।
চারুকলার শিক্ষার্থী উত্তম রায় জাগো নিউজকে বলেন, আমরা প্রাণপণে কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি বেশ ভালোভাবেই কাজ শেষ করতে পারবো।
এদিকে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে বাংলা নববর্ষকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও বিভাগের মধ্যে শুভেচ্ছা কার্ড বিতরণে ধুম পড়েছে।
চারুকলা অনুষদের মৃতশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোস্তফা শরীফ আনোয়ার জাগো নিউজকে বলেন, এবারও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি শেষ করার জন্য আমাদের ছেলে-মেয়েরা কাজ করে যাচ্ছে। শোভাযাত্রাসহ চারুকলা প্রাঙ্গনে মেলা হবে। এবারও সুষ্ঠুভাবে দিনটি উদযাপন করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া মিশু জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য একটা বিশেষ দিন। প্রতিবারই দিবসটি খুব উপভোগ করি। এবার দিবসটি উপলক্ষ্যে চুরি, মালা, ফিতা, বৈশাখী শাড়ীসহ বেশ কিছু প্রসাধনী কিনেছি। আশা করছি এবারের পহেলা বৈশাখেও মজা করতে পারবো।
শুধু মেয়েরা নয়, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে কেনাকাটার ধুম পড়েছে ছেলেদের মধ্যেও। কিনতে শুরু করেছেন ধুতি, পায়জামা-পাঞ্জাবী।
ফোকলোর বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী গাউসুল আজম মিল্টন জাগো নিউজকে বলেন, এবারে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সহপাঠী ও ছোটো-বড়ো ভাইদের সঙ্গে এক রঙের পাঞ্জাবী বানাতে দিয়েছি। সবাই একই পোশাকে হাঁটবো বিষয়টা ভাবতেই ভালো লাগছে।
এক সময় নববর্ষ পালিত হতো আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর। এই কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ)। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসনের উপর ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিতি পায়।
প্রথম দিকে বাংলা চৈত্রমাসের শেষদিনে কৃষকরা জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূস্বামীর খাজনা পরিশোধ করতেন। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ধীরে ধীরে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। সেই থেকে দিবসটি আজও বেশ ঐতিহ্য সহকারেই পালন করা হয়ে থাকে।
রাশেদ রিন্টু/এফএ/পিআর