জয়পুরহাটে ধান সংগ্রহে দুর্নীতির অভিযোগ
জয়পুরহাটে চলতি বোরো মৌসুমে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। খোলা বাজারে মণ প্রতি মোটা ও চিকন ধান প্রকার ভেদে ৪৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকায় বেচাকেনা চলছে।
সেখানে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ৯২০ টাকা দরে কেনার সিদ্ধান্ত নিলেও সরকারি খাদ্যগুদামের সংশ্লিষ্ট কিছু অসৎ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজোশ করে ধান বিক্রি করছেন প্রভাবশালীরা। ফলে এ সুযোগ পাচ্ছেন না সাধারণ কৃষকরা।
জয়পুরহাট জেলা কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্য মতে, এবার ইরি-বোরো মৌসুমে ধান চাষ হয়েছে প্রায় ৭৩ হাজার হেক্টর জমিতে। আর উৎপাদন হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি। এই বিপুল পরিমাণ উৎপাদনের বিপরীতে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান কেনা হবে মাত্র ১২ হাজার ৪৩৩ মেট্রিক টন।
একদিকে খোলা বাজারে প্রতি মণ মোটা ধান ৪৫০ থেকে ৪৭০ টাকা আর চিকন ধান সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা। এতে উৎপাদন খরচও উঠছে না কৃষকদের। 
অন্যদিকে সরকার মণ প্রতি ৯২০ টাকা দরে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিলেও সে সুযোগ পাচ্ছেন না অধিকাংশ নিরীহ কৃষক। অধিকাংশ কৃষক এখনো পাননি কৃষি কার্ড।
আবার অনেকে কৃষি কার্ড পেলেও প্রভাবশালী, মধ্যসত্ত্বভোগী, ফড়িয়া ও দালালদের দৌরাত্মের কারণে তারা এক মুঠো ধানও সরকারি খাদ্য গুদামে বিক্রি করতে পারেননি।
একদিকে খোলা বাজারে দরপতন অন্যদিকে জেলায় বিপুল পরিমাণ উৎপাদনের বিপরীতে সরকারিভাবে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে মাত্র। আবার সেখানেও রয়েছে খাদ্য বিভাগের কিছু অসৎ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজসে প্রভাবশালীদের দাপট।
নিয়মের তোয়াক্কা না করে সরকারি খাদ্য গুদামে দিনে-রাতে এই প্রভাবশালীরা সমানে ধান সরবরাহ করে গুণছেন আশাতীত মুনাফা, আর আফসোস থেকেই যাচ্ছে প্রতারিত কৃষকদের।
জয়পুরহাট সদরের পালি গ্রামের কৃষক ময়েজ উদ্দিন, পাঁচবিবি উপজেলার উঁচাই গ্রামের ছাবেদ আলী, কালাই উপজেলার কাদিরপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেন জানান, সরকারি খাদ্য গুদামে ধান বিক্রির জন্য তাদের মতো অনেক কৃষক এখনো কোনো কৃষি কার্ড পাননি। 
এদিকে, আক্কেলপুর নিচা বাজার এলাকার আব্দুল কাদের, পাঁচবিবি উপজেলার কড়িয়া গ্রামের মন্তাজুল, চানপাড়া গ্রামের বারীক মিয়াসহ জেলার অসংখ্য কৃষক অভিযোগ করেন, তাদের কৃষি কার্ড থাকলেও তারা এখনো সরকারের কাছে ধান বিক্রির সুবিধা পাচ্ছেন না।
কিন্তু প্রভাবশালী চক্র নিরীহ কৃষকদের কাছ থেকে মাত্র ২/৩ শ টাকার বিনিময়ে কৃষি কার্ড সংগ্রহ করার পর খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করে খাদ্য গুদামে শত শত মেট্রিক টন ধান বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন।
এ নিয়ে জয়পুরহাট সদর খাদ্য গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুশফিকুর রহমানকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি প্রভাবশালীদের নাম বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘তাদের আপনারা (সাংবাদিকরা) খাদ্য গুদাম এলাকায় তো দেখতে পান, আমার মুখ দিয়ে কেন বলাতে চান ভাই?’
জেলা খাদ্য সংগ্রহ অভিযানের সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা নন্দলাল পার্শী ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা ও কয়েকজন চাউল কল মালিককেই ইঙ্গিত করে বলেন, কিছু মধ্যসত্ত্বভোগী দালাল ও ফড়িয়া চক্র কৃষকদের কাছ থেকে ২/৪শ টাকার বিনিময়ে কৃষি কার্ড সংগ্রহ করছে।
এরপর তারা খাদ্য গুদামের কিছু অসৎ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা মুনাফা করছেন। ফলে নিরীহ কৃষকরা সরকারি দরে মণ প্রতি ৯২০ টাকা করে ধান বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন না।
এ ব্যাপারে জয়পুরহাট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ইকবাল বাহার চৌধুরী খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রভাবশালীদের অবৈধ লেনদেনের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে বলেন, লাইনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, ধানের ময়েশ্চার বা আর্দ্রতার পরিমাণ সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেক কৃষককে খানিকটা অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। তবে আগামীতে এ সমস্যায় পড়তে হবে না।
রাশেদুজ্জামান/এসএস/এমএস