ঈদ সেলামি ৩৬ লাখ!
ফাইল ছবি
অজুহাত ছিল হাতে সময় কম। ফেরত যাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বিশেষ বরাদ্দের টাকা। এ কারণে তড়িঘড়ি করে বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে দরপত্র ছাড়াই ৩৬ লাখ টাকার কাজ ভাগ বাটোয়ারা করা হয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় থেকে বণ্টন করা এই কাজগুলো নিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত নেতা ও সাংবাদিকরা। তবে সাধারণ ঠিকাদাররা এই প্রক্রিয়াকে অবৈধ আখ্যায়িত করে এটিকে ঈদ সেলামির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
অনুসন্ধান করে জানা গেছে, বণ্টন করা ৩৬ লাখের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দ (এডিবির) ২০ লাখ এবং সাধারণ বরাদ্দের ১৬ লাখ টাকা রয়েছে। নিয়ম অনুসারে দরপত্রের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত ঠিকাদার দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করার কথা এই টাকা। বিগত মে মাসের ২৩ তারিখে এই টাকা বিভিন্ন উপজেলা প্রকৌশলীর হাতে এসে পৌঁছে।
পরবর্তী ১৪ দিনের নির্ধারিত সময় অনুসারে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাজগুলোর ওয়ার্কওর্ডার দেয়ার কথা। সারিয়াকান্দির পাশের উপজেলা সোনাতলা উপজেলা প্রকৌশলী সৈকত দাস বলেন, আমি মে মাসের ২৩ তারিখে বরাদ্দ পেয়েছি। এরপর নিয়ম অনুসারে দরপত্র গ্রহণ ও লটারির মাধ্যমে ৮টি গ্রুপে ভাগ করে কাজ বরাদ্দ দিয়েছি। কিন্তু সুযোগ থাকার পরও এই প্রক্রিয়ায় কাজ বণ্টন সারিয়াকান্দিতে করা হয়নি।
সারিয়াকান্দি উপজেলা প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ২০ জুন রাতে উপজেলা পরিষদ চত্বরে মোট ৩৬ লাখ টাকার কাজ বিনা দরপত্রে নেতাকর্মীদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে দেয়া হয়। এর মধ্যে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক জাহিদুল ইসলাম রাজু তার নিজের ফার্মের নামে দুস্থদের মাঝে সেলাই মেশিন সরবরাহের জন্য পেয়েছেন ৪ লাখ, আওয়ামী লীগের ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক মজিবর রহমান নিজের প্রতিষ্ঠান স্বপ্না এন্টারপ্রাইজের নামে হাটের মাংশ হাটির শেড নির্মাণের জন্য পেয়েছেন ৪ লাখ।
এছাড়া যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক মাসেদুল হক ঠান্ডা নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে গরীব মানুষের মাঝে সেলাই মেশিন দেয়ার জন্য পেয়েছেন ১ লাখ ৫০ হাজার, যুবলীগের সভাপতি আইয়ুব তরফদার সূচি এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ধার করা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে বোহাইল হাটগামী রাস্তায় কালভার্ট নির্মাণের জন্য পেয়েছেন ২ লাখ, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুল ইসলাম পটল ধার করা প্রতিষ্ঠান রাসেল এন্টারপ্রাইজের নামে বালিকা বিদ্যালয়ের ফটোকপি মেশিন ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসবাবপত্র সরবরাহের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার বরাদ্দ পেয়েছেন।
এদিকে, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মাছুদুর রহমান হিরু স্থানীয় সাংবাদিক রফিকুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান রুমি এন্টারপ্রাইজের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলার সামগ্রী বিতরণের জন্য ২ লাখ, ভাইস চেয়ারম্যান ২ জন যথাক্রমে জামায়াত নেতা নজরুল ইসলাম ও বিএনপি কর্মী গোলাপি বেগম নলকূপ ও ল্যাট্রিন সামগ্রী সরবরাহের জন্য ৪ লাখ, স্থানীয় সাংবাদিক খায়রুল আলম সরদার তার নিজ প্রতিষ্ঠানের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেঞ্চ সরবরাহের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ পেয়েছেন।
এছাড়া, স্থানীয় সাংসদ আব্দুল মান্নানের চাচাতো ভাই মামুন জিয়াউল হক রতন সরদারকে ধার করা প্রতিষ্ঠান বাসুদেব সাহা টেডার্সের নামে মাছিরপাড়া রাস্তায় কালভার্ট নির্মাণের জন্য ২ লাখ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বরাদ্দ দেয়া এই কাজের মধ্যে উপজেলার ২ জন ভাইস চেয়ারম্যানের কাজটি এবং উপজেলা ১২টি ইউনিয়নের প্রতি চেয়ারম্যানকে উন্নয়ন কাজ করার জন্য ১ লাখ টাকা করে প্রদান সাধারণ বরাদ্দের মধ্যে থেকে খরচ দেখানো হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বরাদ্দ থেকেই এই কাজগুলো বণ্টন করা হয়। কাজ শেষ করার সময় হলো ৩১ জুন। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যেই বরাদ্দের টাকা সরকারি কোষাগার থেকে উত্তোলন করতে হবে। কিন্তু গতকাল রোববার পর্যন্ত স্থানীয় উপজেলা প্রকৌশল কার্যলয় থেকে কোনো ঠিকাদার কোথায় কিভাবে কি পরিমাণ কাজ করবেন তার কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। স্বাভাবিক কারণেই কেউই উল্লেখ করার মতো কাজ শুরু করেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডির একজন ঠিকাদার জানান,পূর্ব পরিকল্পিতভাবে কাজগুলো ভাগ বাটোয়ারা করার জন্য টেন্ডার ছাড়াই কোটেশনের মাধ্যমে পছন্দের ব্যক্তিদের দেয়া হয়েছে। আর বিষয়টি যাতে গোপন রাখা যায় সে কারণে বণ্টন প্রক্রিয়ার মধ্যে ক্ষমতাসীন দল ছাড়াও বিএনপি, জামায়াত ও সাংবাদিকদের রাখা হয়েছে।
বরাদ্দের মধ্যে আওয়ামী লীগের ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক মজিবর রহমান নিজের প্রতিষ্ঠার স্বপ্না এন্টারপ্রাইজের নামে হাটের মাংশ হাটির শেড নির্মাণের জন্য পেয়েছেন ৪ লাখ। জানতে চাইলে তিনি বললেন, আমি কাজটি কবে পেয়েছি তা মনে নেই। তবে শেড নির্মাণ কাজ শেষের দিকে। এখন অল্প কিছু কাজ বাকি রয়েছে।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি যে কাজ পেয়েছেন সেটি মাত্র শুরু করেছেন। পুরো কাজ এখনো বাকি রয়েছে। অথচ অর্থবছর শেষ হতে আর মাত্র ৫ দিন রয়েছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকৌশলী শাহ মো. শহিদুল ইসলাম জানান, সময় স্বল্পতার কারণে কোটেশনের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। তাই টেন্ডার করার প্রয়োজন পড়েনি। আর যে কাজ রয়েছে তা ৩১ তারিখের মধ্যেই সম্পন্ন করা যাবে। যারা কাজ পেয়েছেন তারা সকলেই ঠিকাদার বলে দাবি করেন তিনি।
এসএস/এবিএস