৫০ বছরে সবচেয়ে তীব্র শীত সাতক্ষীরায়
দেশের উত্তরাঞ্চলে শীত আসে মৌসুমের শুরুতেই। তবে দেশের একেবারে দক্ষিণের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় শীত সাধারণত একটু দেরিতে আসে এবং তীব্রতাও তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু চলতি শীতে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। শীত শুরু হতে কিছুটা দেরি হলেও তীব্রতায় তা ছাড়িয়ে গেছে গত ৫০ বছরের সব রেকর্ড।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জাগো নিউজকে জানান, চলতি শীত মৌসুমে জেলায় সবচেয়ে কম তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে আজ বুধবার (৭ জানুয়ারি) ৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটিই গত ৫০ বছরে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এদিন বাতাসের আর্দ্রতা রেকর্ড করা হয়েছে ৯৮ শতাংশের ওপরে।
তিনি বলেন, গত ৫০ বছরের মধ্যে সাতক্ষীরায় এবারই প্রথম এত কম তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা সাধারণত ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকত।
তিনি আরও বলেন, চলতি শীতে কয়েকটি শৈত্যপ্রবাহ এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাবে, যার ফলে ঘন কুয়াশা ও তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। মূলত বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বিগত ও আগামী কয়েক বছরের আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
কনকনে শীত আর বরফশীতল বাতাসে থমকে গেছে জনজীবন। ঘন কুয়াশার মায়াজালে ঢাকা পড়েছে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। গত দুদিন ধরে সূর্যের দেখা মেলেনি বললেই চলে। প্রকৃতি যখন কাঁপছে, তখন সবচেয়ে বেশি কাঁপছে ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন। শীতের হাত থেকে বাঁচতে গ্রাম ও শহরের মোড়ে মোড়ে খড়কুটো আর শুকনো লতাপাতা জ্বালিয়ে আগুন পোহানোর চিরচেনা দৃশ্যই এখন বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা।
অতিরিক্ত শীতে ঘরের বাইরে কম বের হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরম কাপড় পরার পাশাপাশি পরিষ্কার পানি পান করা জরুরি। বয়স্কদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন।

মাঠের ফসল রক্ষায় খড় বা পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখতে বলছে কৃষি বিভাগ। কুল ও আম চাষিদের দেওয়া হচ্ছে স্প্রে করার পরামর্শ।
এত শীতে অভ্যস্ত নয় মানুষ
স্থানীয়দের দাবি, উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকা হওয়ায় সাতক্ষীরায় বরাবরই শীতের তীব্রতা তুলনামূলক কম থাকে। ফলে অধিকাংশ মানুষের কাছে নেই ভারী লেপ বা কম্বল। আগাম কোনো সতর্কতা না থাকায় প্রস্তুতিও ছিল সীমিত।
তালা উপজেলার কুমিরা এলাকার মাহবুব হোসেন বলেন, ছোট থেকে কখনও এমন শীত অনুভব করিনি। আমাদের শীতের পোশাকও খুব ভারী না। ফলে এই পরিমাণ শীত নিবারণের মতো পোশাক নেই। অনেকে সারাদিন লেপের মধ্যেই থাকছে। বাড়ির নারী ও শিশুরা সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়েছে।
শীতের তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি ভুগছেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। সাতক্ষীরা সদরের মাছখোলা এলাকার গৃহবধূ রেহানা বেগম বলেন, রাতে বাচ্চাদের কান্না থামানো যায় না। কম্বল একটাই, সবাইকে ঢেকে রাখা যায় না। ঠান্ডায় বাচ্চাদের জ্বর-কাশি শুরু হয়েছে।
তালা উপজেলার ঘোণা গ্রামের ১০ বছরের শিশু সুমাইয়া জানায়, স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হয়। সকালে রোদ ওঠে না, হাত-পা খুব ঠান্ডা থাকে।
একই এলাকার ৭০ বছর বয়সী নূর ইসলাম বলেন, জীবনে অনেক শীত দেখেছি, কিন্তু এমন শীত না। রাতে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, শরীর ব্যথায় ভেঙে যায়।
স্থবির জনজীবন, বিপাকে খেটে খাওয়া মানুষ
তীব্র শীতে দিনমজুর ও রিকশাচালকদের জীবন হয়ে উঠেছে আরও কঠিন। সাতক্ষীরা শহরের ভ্যানচালক সালাম হোসেন বলেন, হাত-পা জমে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। কুয়াশায় রাস্তা দেখা যায় না, ভ্যান চালাবো কী করে? শহরের বস্তি ও গ্রামাঞ্চলের মোড়ে মোড়ে ছিন্নমূল মানুষ আগুন জ্বালিয়ে উষ্ণতা খুঁজছেন। পরিত্যক্ত কাঠ আর শুকনো লতাপাতার এই আগুনই যেন তাদের যান্ত্রিক জীবনের শেষ ভরসা।
কৃষিতে শঙ্কা, বীজতলা ও ফল চাষ ব্যাহত
তীব্র শীত ও অতিরিক্ত কুয়াশার কারণে কৃষিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেক এলাকায় ধানের বীজতলা তৈরি ব্যাহত হচ্ছে। সবজি চাষেও দেখা দিয়েছে সমস্যা। জেলায় প্রচুর পরিমাণে কুল ও আম উৎপাদন হলেও চলতি শীতে মুকুল ঝরে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন চাষিরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম বলেন, তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে বীজতলা ও শীতকালীন সবজিতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সকালে কুয়াশা কাটার পর কৃষকদের জমিতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে খড় বা পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখতে বলা হয়েছে। কুল ও আম চাষিদের গাছে প্রয়োজনীয় স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আম গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক মাঠে থেকে কৃষকদের এই বিষয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা করছে।
চিকিৎসকের পরামর্শ
তীব্র শীতে শিশুদের নিউমোনিয়া ও বয়স্কদের শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সামছুর রহমান বলেন, শিশুদের ভোরে বাইরে না নেওয়া, গরম কাপড় পরানো এবং পরিষ্কার পানি পান করানো জরুরি। বয়স্কদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন।
শীতের এই হাহাকারের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে ছিন্নমূলদের পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা কম্বল বিতরণ করেছেন। তবে সেটি পর্যাপ্ত নয়।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ আফরোজা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, শীতে নিম্ন আয়ের মানুষ ও শিশুরা চরম কষ্টে আছে। সরকারের পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র বিতরণ অব্যাহত থাকবে।
এফএ/এএসএম