ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

মেহেরপুরে দুই আসনেই বিএনপি-জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

জেলা প্রতিনিধি | মেহেরপুর | প্রকাশিত: ০৬:২০ পিএম, ০৮ জানুয়ারি ২০২৬

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মেহেরপুরের দুটি সংসদীয় আসনে নির্বাচনি উত্তাপ তুঙ্গে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থীদের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর এখন মাঠের মূল লড়াই জমে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। সভা-সমাবেশ আর গণসংযোগে মুখর এখন মেহেরপুর-১ ও মেহেরপুর-২ নির্বাচনি এলাকা।

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, মেহেরপুর-১ (সদর-মুজিবনগর) আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মাসুদ অরুন। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তিনি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী আগেভাগেই তাদের জেলা আমির তাজউদ্দীন খানকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে।

তবে এই আসনটিতে বিএনপির একাধিক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন। তারা হলেন- জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান, মুজিবনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিরুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রোমানা আহমেদ। তবে মনোনয়ন যাচাই বাছাইয়ে দলীয় মনোনয়ন না থাকায় বাদ পড়েছেন তারা।

এর বাইরে এই আসনটিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন ঢাকা মহানগর এনসিপির যুগ্ম সম্পাদক সোহেল রানা। তবে যাচাই-বাছাই তিনিও বাদ পড়েছেন। বাদ পড়েন অরাজনৈতিক স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহাবুব রহমান এবং সিপিবির প্রার্থী আইনজীবী মিজানুর রহমান।

এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জেলা সভাপতি আব্দুল হামিদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে। আসনটিতে জাতীয় পার্টির তেমন কোনো প্রচার প্রচারণা বা সভা সমাবেশ হতে দেখা যায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে এই দুই আসনেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরাই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। অন্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা থাকলেও ভোটের মূল সমীকরণ ঘুরছে এই দুই দলের মধ্যেই।

গণসংযোগকালে বিএনপি প্রার্থী মাসুদ অরুণ বলেন, এই আসনের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জনগণই তাদের রায় দেবে। আমি নির্বাচিত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেব।

অন্যদিকে, এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী তাজউদ্দীন খান বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায়। ন্যায়বিচার, সুশাসন ও ইসলামী মূল্যবোধের রাজনীতির পক্ষে মানুষ এখন ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। আমরা আশাবাদী, ভোটাররা আমাদের দিকেই তাকাবে।

স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, সদর ও মুজিবনগর এলাকায় দুই দলেরই শক্ত সংগঠন রয়েছে। ফলে এখানে ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হবে ভোটার উপস্থিতি ও শেষ মুহূর্তের প্রচারণার ওপর।

মুজিবনগর উপজেলার জয়পুর গ্রামের নারী ভোটার শিউলি খাতুন জানান, আমরা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই। যেই দল মানুষের নিরাপত্তা, শিক্ষা আর চিকিৎসার বিষয়টি গুরুত্ব দেবে, সেদিকেই আমাদের ভোট যাবে।

মেহেরপুর গাংনী ডিগ্রি কলেজের সাবেক শিক্ষক এনামুল আজিম জানান, এই আসনে দুই দলেরই সাংগঠনিক শক্তি রয়েছে। তবে ফল নির্ভর করবে ভোটার উপস্থিতি, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং শেষ মুহূর্তের প্রচারণার ওপর। জনগণ যদি নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে, তাহলে প্রকৃত জনমতই প্রতিফলিত হবে।

মেহেরপুর-২ আসনের চিত্র

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা নিয়ে গঠিত মেহেরপুর-২ আসনেও নির্বাচনি উত্তাপ কম নয়। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আমজাদ হোসেন। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে প্রথমবারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদের সঙ্গে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। তাদের কর্মী সমর্থকেরা একে অপরের দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর চালান।

বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা যায়, আমজাদ হোসেনের মনোনয়ন প্রত্যাহারের দাবিতে টানা এক মাস নানান কর্মসূচি পালন করে জাভেদ মাসুদের অনুসারীরা। কিন্তু সর্বশেষ আমজাদ হোসেনকেই চূড়ান্ত মনোনীত করে বিএনপি। এই কারণে জাভেদ মাসুদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন উত্তোলন করেও দাখিল করেননি।

অন্যদিকে উপজেলা জামায়াতের আমির নাজমুল হুদাকে জামায়াত ইসলামের মনোনয়ন দিয়েছে। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তাও তাকে বৈধ ঘোষণা করেছে। এই দুই প্রার্থীর বাইরে জাতীয় পার্টির আব্দুল বাকি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তবে জাতীয় পার্টির প্রভাব এই এলাকায় খুব কম থাকায় তাকে নিয়ে তেমন আলোচনা শোনা যায়নি।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গাংনী আসনে বিএনপি ও জামায়াতের ভোটব্যাংক প্রায় কাছাকাছি। ফলে এই আসনে ভোটের ফলাফল নির্ধারণে ভোটার উপস্থিতি ও শেষ মুহূর্তের নির্বাচনি কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক টানার চেষ্টা করছেন এই দুই প্রার্থীই।

স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই আসনে উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা ও ভোটাধিকার ইস্যু প্রধান আলোচনায় রয়েছে। অনেক ভোটারই বলছেন, তারা দল নয়, যোগ্য প্রার্থীকে মূল্যায়ন করতে চান।

বিএনপি প্রার্থী আমজাদ হোসেব বলেন, গাংনীর মানুষ উন্নয়ন ও নিরাপত্তা চায়। আমি দীর্ঘদিন মানুষের পাশে ছিলাম। নির্বাচিত হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিখাতে বিশেষ গুরুত্ব দেব।

জামায়াত প্রার্থী নাজমুল হুদা বলেন, এই আসনে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। আমরা দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। ভোটাররা যদি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন, তাহলে ফল আমাদের পক্ষে আসবে বলে বিশ্বাস করি।

ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভোটাধিকারই এই আসনের প্রধান আলোচ্য বিষয়। গাংনী পৌর এলাকার ভোটার শামীম হোসেন জানান, আমরা চাই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। যিনি এলাকায় উন্নয়ন করবেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন—তাকেই ভোট দেব। দল নয়, প্রার্থীই মুখ্য।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মেহেরপুরের দুই আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের ভোটব্যাংক কাছাকাছি। ফলে অল্প ব্যবধানেই জয়-পরাজয়ের ফল নির্ধারিত হতে পারে। নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভোটার উপস্থিতিই হবে চূড়ান্ত ফ্যাক্টর।

মেহেরপুর সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)- এর সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন জানান, এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে হাড্ডাহাড্ডি। অল্প ব্যবধানেই ফল নির্ধারিত হতে পারে। সুষ্ঠু পরিবেশ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হলে জনগণের প্রকৃত মতামতই প্রতিফলিত হবে।

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, মেহেরপুর-১ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৩ জন। এদের মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৫৯ হাজার ৮০ জন, পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮০ জন এবং হিজড়া ভোটার ৩ জন।

অপরদিকে মেহেরপুর-২ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৭ জন। এদের মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬০৭ জন, পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৭ জন এবং হিজড়া ভোটার ৩ জন।

আসিফ ইকবাল/কেএইচকে/এএসএম