ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

কক্সবাজার

আড়াই মাসে পাচারের চেষ্টাকালে ৪৪৭ রোহিঙ্গা উদ্ধার

জেলা প্রতিনিধি | কক্সবাজার | প্রকাশিত: ০৪:৫৬ পিএম, ১০ জানুয়ারি ২০২৬

আড়াই মাসে পাচারের চেষ্টাকালে ৪৪৭ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সর্বশেষ ৪ জানুয়ারি বঙ্গোপসাগরে সেন্টমার্টিনের অদূরে ট্রলার থেকে ২৭৩ জনকে উদ্ধার করেছে নৌবাহিনীর সদস্যরা।

অভিযোগ রয়েছে, পাচারকারী চক্রের মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় মানবপাচার চেষ্টা বন্ধ হচ্ছে না। ফলে সক্রিয় দালালচক্র উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গাদের প্রতিটি ক্যাম্পভিত্তিক অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।

তবে অবৈধভাবে বিপজ্জনক সাগরপথে পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে বলে দাবি করেছেন কক্সবাজার জেলা পুলিশের ফোকাল পয়েন্ট অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিনের অদূরে বঙ্গোপসাগর থেকে একটি ট্রলার জব্দ করে দালালসহ ২৭৩ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়। যার বেশিরভাগ নারী ও শিশু।

আড়াইমাসে পাচারের চেষ্টাকালে ৪৪৭ রোহিঙ্গা উদ্ধার

এছাড়া ২৮ ডিসেম্বর বিজিবি ১৮ জনকে আটক করে। ২৫ নভেম্বর কোস্টগার্ড আটক করে ২৮ জন, ২৯ অক্টোবর একই বাহিনী ২৬ জন, একইদিন র‍্যাব আটক করে ২৪ জন, ২৬ অক্টোবর কোস্টগার্ড আটক করে পাঁচজন ও ২৪ অক্টোবর ৪৪ জন এবং ২২ অক্টোবর বিজিবি আটক করে ২৯ জন পাচার ভিকটিম উদ্ধার করা হয়।

টেকনাফের বাহারছড়া গহীন পাহাড় ও মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন এলাকা, সমুদ্র উপকূল এবং সেন্টমার্টিনের অদূরে বঙ্গোপসাগর থেকে তাদের উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট।

উদ্ধার রোহিঙ্গা নারীদের বরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, অবিবাহিত নারীদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলে। আবার যেসব নারীর স্বামী মালয়েশিয়ায় তারাও যে কোনোভাবে মালয়েশিয়া যেতে উন্মুখ। আরাকানে (রাখাইনে) যাদের অবস্থা সচল ছিল সেসব পরিবার যে কোনো মূল্যে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা মালয়েশিয়া যেতে তৎপর। অনেক তরুণী ও কম বয়সে বিধবা নারীরাই মালয়েশিয়া যেতে প্রতিনিয়ত চেষ্টা অব্যাহত রাখছে। যে কোনোদিন সুযোগ কাজে লাগলে তারা সফল হবে বলে আশাবাদী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পলিথিনের ঝুপড়ি ঘর থেকে বেরুতে চাওয়ার বাসনা রয়েছে, এমন নারী-পুরুষের বিষয়ে জানা ক্যাম্পভিত্তিক দালালরা বিভিন্ন প্রলোভনে মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুকদের উদ্বুদ্ধ করে। এমনকি ক্যাম্পে থাকলে একদিন মিয়ানমারে ফেরত যেতে হবে বলেও ভয় দেখায়। যুবকদের ভাল বেতনের চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়। ফলে অনেক রোহিঙ্গা তাদের ফাঁদে পড়ে মালয়েশিয়া যেতে আগ্রহী হয়ে উঠে।

সূত্র আরও জানায়, মালয়েশিয়া যেতে রাজি হওয়াদের কাছ থেকে দশ থেকে বিশ হাজার টাকা ‘টোকেন মানি’ আদায় করা হয়। চুক্তি হয় মালয়েশিয়া পৌঁছে গেলে বাকি টাকা দেওয়ার। ক্যাম্পের দালালদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে রয়েছে সুযোগসন্ধানী বাংলাদেশি দালালও। রাজি হওয়া রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প হতে বের করে তাদের বাংলাদেশি দালালদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। আর বাংলাদেশি দালালরা সুযোগ বুঝে ট্রলার বা নৌকায় সাগরে অবস্থান করা জাহাজে তুলে দেয়ার চেষ্টা চালায়। ক্ষেত্র বিশেষে তারা ধরা পড়লেও অনেক ক্ষেত্রে সফল হয় বলে দাবি করেছেন মালয়েশিয়ার জন্য ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়া অনেকে।

অভিযোগ রয়েছে, মানবপাচার চক্রের খপ্পরে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে অনেক রোহিঙ্গা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কোনো জবাবদিহিতা নেই জেনে উদ্বাস্তু এসব রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে মিথ্যার আশ্রয় নেয় দালালরা। তারা সাগরে ট্রলার অপেক্ষা করছে উল্লেখ করে টাকা হাতায়। ধরা না পড়ে তীরে পৌঁছে গেলে পাচারকারীরা রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া নিয়ে যাবার নামে ট্রলারে তুলে সাগরে দু-তিন দিন ঘুরিয়ে টেকনাফ বা উপকূলের কোনো না কোনো এলাকায় নামিয়ে দেয় এবং বলে যে, তারা মালয়েশিয়ার তীরে পৌঁছেছে। শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিম চর, সোনাদিয়া দ্বীপ, সেন্টমার্টিনসহ উপকূলে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। সেসব রোহিঙ্গাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পরে তাদের ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়।

অপর এক সূত্র মতে, জনপ্রতি টাকা হাতে চলে এলে শৃঙ্খলাবাহিনীর পরিচিত কোনো বিভাগের সদস্যদের তথ্য দিয়ে জড়ো হওয়া রোহিঙ্গাদের ধরিয়ে দেওয়া হয়। এসময় দালালরা সটকে পড়ে। এতে কিছু না করেই একটি মোটা অংকের টাকা আয় হয় চক্রের।

বেসরকারি সংস্থা উইনরক ইন্টারন্যাশনালের কক্সবাজার অফিসের মানবপাচার রোধ প্রকল্পের সমন্বয়ক মুহাম্মদ শাহ আলম বলেন, সুন্দর জীবনের স্বপ্ন ও প্রতারণার মাঝেও শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় অনেকে সাগর তীরে মালয়েশিয়া যাত্রার ইতি টানলেও ‘মানবপাচার’ চেষ্টা থামছে না। তবে পাচারের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের গ্রেফতার করা না গেলে সাগর পথে মালয়েশিয়া পাচার বন্ধ হবে না বলে মনে করেন সচেতন মহল। মানবপাচার প্রতিরোধে তৃণমূলে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ চলছে।

আড়াইমাসে পাচারের চেষ্টাকালে ৪৪৭ রোহিঙ্গা উদ্ধার

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, আর্থিক দৈন্যতা ও লোভ আমাদের পাচারের ঝুঁকিতে ফেলছে। জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের মানুষ পাচারের শিকার হয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সমন্বিত কাজ করলে পাচার রোধ অনেকাংশে সম্ভব।

র‌্যাব-৭ কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন লে. কর্নেল নাইমুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিত্তিক পাচারচক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। চিহ্নিত দালালদের অনেকে আইনের আওতায় এসেছে। বাকিদেরও বিষয়েও সচেষ্ট রয়েছে শৃঙ্খলাবাহিনী।

নৌবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ জানায়, দেশের সাগরপথ সুরক্ষা রাখতে সবাই কাজ করছি আমরা। সাগরপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচার ঠেকাতে সবসময় সজাগ রয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের চেষ্টার কমতি যেমন নেই, তেমনি পাচারকারীদের অপচেষ্টাও থামছে না। সাগরপথে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে মানবপাচার চেষ্টার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে আলোচনা হয়। উপকূল ও সাগরের যেসব পয়েন্ট দিয়ে মানবপাচারের আশঙ্কা আছে, সেখানে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে নজরদারি বাড়াতে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। সঙ্গে পাচারচক্রের ব্যাপারেও খোঁজ নিয়ে দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসার তাগাদা দেওয়া হয়েছে।

সায়ীদ আলমগীর/আরএইচ/এএসএম