অধ্যাপক আলী রীয়াজ
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবেন
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবশ্যই গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবেন, এতে কোনো বাধা নেই। দেশে যেন অতীতের শাসনের পুনরাবৃত্তি না হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমেই তা নিশ্চিত হবে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) ময়মনসিংহের টাউন হল অ্যাডভোকেট তারেক স্মৃতি অডিটরিয়ামে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশে বিভাগীয় কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রশাসনের আয়োজনে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে জুলাই সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও ইনসাফ কায়েমের জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে।
তিনি বলেন, সংবিধানের ৭ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু এতদিন সেই জনগণকেই বঞ্চিত রাখা হয়েছে। বিবেকের তাড়নায় গণভোটে অংশগ্রহণ জরুরি যেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ অতীতের মতো না হয়। মনে রাখবেন, গণভোটের জয়ের মাধ্যমে আপনার কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন সম্ভব। আমরা একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র তৈরির পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছরেও আমরা তা অর্জন করতে পারিনি। সময় এসেছে গণভোটে রায়ের মাধ্যমে জনগণের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণের। গণভোটের লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার।
সংসদের উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয় তুলে ধরে তিনি বলেন, বিগত সময়ে সংবিধান সংশোধন এক ধরনের ছেলে খেলায় পরিণত হয়েছিল। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বিরোধী দল অংশগ্রহণ করে নাই, অধিকাংশের মতামত ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংস্কার। কিন্তু মাত্র চার মিনিটের এক বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সেই সংস্কারের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচিত সরকারই ৪২ শতাংশের অধিক ভোট পায়নি।
তিনি বলেন, সংস্কার প্রস্তাব অনুসারে, সংবিধানের উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতে ১০০টি আসন থাকবে। অর্থাৎ যে দল মোট ভোটের মাত্র ৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে কিন্তু সরকার গঠন করতে পারেনি, তারও ৫ জন প্রতিনিধিত্ব থাকবে সংসদের উচ্চকক্ষে। আর সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগবে (কমপক্ষে ৫১ ভোটের সমর্থন)।
রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ও দায়িত্ব সম্পর্কে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বিগত সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতেই সব হতো। সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতি কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ব্যতীত অন্য কোনো সিদ্ধান্ত এককভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। অথচ বলা হয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, সচিবালয়, বিচার ব্যবস্থায় বিচারপতি নিয়োগ এসব রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পদায়ন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এগুলো তৎকালীন সরকারপ্রধানের ইচ্ছা অনুসারেই হয়ে থাকে। আবার সেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও হয় পরোক্ষভাবে। তাই সেখানে সরকার মনোনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তাই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ও কার্যাবলি নিরূপণে সংবিধান সংস্কারে জরুরি।
সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ সম্পর্কে তিনি বলেন, ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ হলো নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে প্রার্থীতা বাতিল, যা এমপিদের মুখে স্কচটেপ এঁটে দেওয়ার মতো। সংস্কার প্রস্তাবে অর্থবিল এবং আস্থা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে নিজ নিজ দলের অনুগত থাকবে, অন্য কোনো বিষয়ে স্বাধীন মতামত প্রদান করতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল উদ্দেশ্য সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের মত বিষয় যেন সম্মানের সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারি তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা এমন একটা সমাজ চাই, যে সমাজে আমার সন্তানের পরিচয় নির্ধারণ হবে তার যোগ্যতার ওপর তার অর্জিত জ্ঞান ও প্রচেষ্টার ওপর। সে কার সন্তান কত মানুষ তাকে চিনে এটা তার পরিচয়ের মাপ কাঠি হবে না।
উপদেষ্টা বলেন, আগামী নির্বাচনে ফ্যাসিবাদ তৈরি করতে বিভিন্নভাবে অপপ্রচার চানানো হচ্ছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিলে সংবিধানে বিসমিল্লাহ থাকবে না, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিলে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস থাকবে না- এসব বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, যা এ্যাবসলুটলি বোগাস। এসময় তিনি অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হতে সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার বলেন, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব মর্যাদার সহিত হবে নাকি স্বৈরাচারী হবে, জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে হবে নাকি বিপক্ষে হবে তার জন্যই গণভোট। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার সুরক্ষার জন্য এটি জরুরি। গণভোটের প্রধান লক্ষ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার বিভিন্ন সিস্টেমের সংস্কার। সংবিধানের ফাঁক-ফোকর বন্ধ করতে হবে, এজন্য সংবিধান সংস্কার এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন সংস্কার, প্রজাতন্ত্রের স্বচ্ছ নিয়োগের জন্য পিএসসি সংস্কার। এ সকল রোগের ব্যবস্থাপত্র হলো এ জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ যা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ (সংবিধান সংস্কার) নামে পরিচিত।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার ফারাহ শাম্মীর সভাপতিত্বে ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজি মো. আতাউল কিবরিয়া এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) উপাচার্য ড. এ.কে. ফজলুল হক ভুঁইয়া বক্তব্য দেন। এসময় ময়মনসিংহ বিভাগীয় বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান, চার জেলার জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কামরুজ্জামান মিন্টু/কেএইচকে/জেআইএম
সর্বশেষ - দেশজুড়ে
- ১ বিএনপিতে যোগ দিলেন এনসিপির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী
- ২ বিএনপি সরকার গঠন করলে ব্যবসা-বাণিজ্য নির্বিঘ্নে চলবে: টুকু
- ৩ সংবিধানের ওপরে বিসমিল্লাহ লেখা আছে-থাকবে: ধর্ম উপদেষ্টা
- ৪ ল্যাম্পপোস্টের খুঁটিতে উঠে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেলো দুই বন্ধুর
- ৫ গণভোটের গোলাপি ব্যালটই নির্ধারণ করবে জাতির ২০-৫০ বছরের ভবিষ্যৎ