কুড়িগ্রাম
১০৮ ইটভাটার ৭০টিই অবৈধ, ধোঁয়া-ছাইয়ে বিপন্ন জনজীবন
কুড়িগ্রামে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও বিদ্যমান আইন তোয়াক্কা না করেই চলছে অবৈধ ইটভাটার রাজত্ব। জেলার সচল ১০৮টি ইটভাটার মধ্যে ৭০টিরই নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করেই বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোল ঘেঁষে বছরের পর বছর এসব অবৈধ ভাটা চালু রাখা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৩ সালের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স ও পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ভাটা স্থাপন বা ইট প্রস্তুত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। নিয়ম অনুযায়ী, জনবসতি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক কিলোমিটারের মধ্যে ভাটা নিষিদ্ধ থাকলেও কুড়িগ্রামের অনেক ভাটা গড়ে উঠেছে মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে।
জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ইটভাটা মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ১০৮টি ইটভাটা চালু রয়েছে এবং চলতি মৌসুমে সবকটিতেই ইট পোড়ানো হচ্ছে। প্রতিটি ভাটায় গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ জন শ্রমিক কাজ করেন। একটি ভাটায় বছরে গড়ে ৬৫ লাখের বেশি ইট উৎপাদন হয়। চলতি মৌসুমে এ পর্যন্ত ১৭টি অভিযান চালিয়ে ৩১টি ইটভাটায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে কোনো ভাটাই বন্ধ করা হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জরিমানা করার পর অদৃশ্য কারণে পুনরায় সেসব ভাটায় কাজ শুরু হয়। নির্দিষ্ট মাসোহারা না দিলেই কেবল ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানার মুখে পড়তে হয়।

জানা গেছে, ইটভাটার জন্য ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি, খাসজমি, বিল ও খাল থেকে মাটি কেটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব মাটি পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাক্টরের কারণে গ্রামীণ সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি ইটভাটার ধোঁয়া ও ছাইয়ে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, ফসলি জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে।
সরেজমিনে উলিপুর উপজেলা ও কুড়িগ্রাম সদরের কয়েকটি ইটভাটায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভাটার আশপাশেই রয়েছে ফসলি জমি, বিদ্যালয়, বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সড়ক ও ঘন জনবসতি। এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশেই নির্বিঘ্নে ইট পোড়ানো হচ্ছে।
উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের বোতলা গ্রামের কুড়িগ্রাম জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি লুৎফর রহমান বকসীর মালিকানাধীন আরএম ব্রিকস ইটভাটার পাশেই রয়েছে জনতা হাট উচ্চ বিদ্যালয়, জনতাহাট দাখিল মাদ্রাসা ও একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা। যদিও কাগজে ভাটার নাম আরএম ব্রিকস, সরেজমিনে সেখানে এলআরডি নামে ইট প্রস্তুত করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
চাঁদপুরে সড়কজুড়ে অবৈধ বালুর ব্যবসা, হুমকির মুখে পরিবেশ
৩০ বর্গ কিলোমিটারে ৩৬ ইটভাটা
কৃষিজমির মাটি-বালু যাচ্ছে ইটভাটায়, নির্বিকার প্রশাসন
বোতলা গ্রামের বাসিন্দা ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম জানায়, ইটভাটার ধুলাবালি ও যানবাহনের শব্দে নিয়মিত ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কয়লার ছাই ও ধোঁয়ার কারণে গত বছর তার বাড়ির ৯টি আমগাছে মাত্র পাঁচটি আম ধরেছিল, সেগুলোও পরিপক্ব হওয়ার আগেই পচে নষ্ট হয়ে যায়।
সদর উপজেলার যতিনেরহাট এলাকার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইটভাটার ধুলাবালি ও কয়লার কণায় শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ফসল ও ফলগাছের উৎপাদনও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কয়েকটি ইটভাটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিভিন্ন দপ্তর ও প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করেই ভাটা চালাতে হয়। টাকা না দিলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
কুড়িগ্রাম ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি লুৎফর রহমান বকসী বলেন, জেলায় প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ইটভাটায় কাজ করেন এবং তাদের পরিবারের জীবিকা এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তিনি দাবি করেন, প্রতিবছর প্রতিটি ভাটা থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা রাজস্ব দেওয়া হয়। ইটভাটা সংক্রান্ত নীতিমালা আরও সহজ করার দাবি জানান তিনি।
কুড়িগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, জেলায় ১০৮টি ইটভাটার মধ্যে ৩৮টির পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে। মামলা জটিলতার কারণে অবৈধ ভাটাগুলো বন্ধ করা যাচ্ছে না। তবে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ভাটা চালানোর অভিযোগকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেন।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে। খাসজমি, নদী ও বিলের মাটি কাটার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলআর ফান্ডে টাকা জমা দিয়ে অবৈধ ইটভাটা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর এলআর ফান্ড বন্ধ করে দিয়েছেন।
রোকনুজ্জামান মানু/কেএইচকে/এমএস