ব্রহ্মপুত্র নদে হাওরের প্রমোদতরি ‘মাস্তুল’
নদীনির্ভর ঐতিহ্য ও পর্যটনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদে যাত্রা শুরু করেছে হাওরের প্রমোদতরি ‘মাস্তুল’। চিলমারী নদীবন্দরকে কেন্দ্র করে নদী, চর ও গ্রামীণ জনপদভিত্তিক পর্যটন বিকাশে এ প্রমোদতরিকে একটি নতুন উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা।
প্রমোদতরি ‘মাস্তুল’-এর কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ‘মাস্তুল’ চিলমারী নদীবন্দরে অবস্থান করবে। এখান থেকে পর্যটক নিয়ে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র মিলনস্থল, ধরলা-ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, গঙ্গাধর ও ব্রহ্মপুত্র তিন নদীর মোহনা, ব্রহ্মপুত্রের বাংলাদেশের প্রবেশমুখ এবং রৌমারী বন্দর হয়ে সাহেবের আলগা পর্যন্ত বিভিন্ন নদী, চর ও গ্রামীণ জনপদে ভ্রমণের ব্যবস্থা থাকবে। মাস্তুলে একদিনের নৌবিহার ও দুদিন এক রাতের অতিথিসেবা চালু আছে।
এছাড়া কেউ চাইলে পরিবারের সদস্যদের জন্য নিজেদের মতো করে ভাড়া নিয়েও ভ্রমণ করতে পারবেন। দৈর্ঘ্যে ১৬০ ফুট ও প্রস্থে ১৬ ফুট এ প্রমোদতরি ‘মাস্তুল’-এ ২৮ জন অতিথির থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রমোদতরি ‘মাস্তুল’-এর যাত্রায় পদ্মার মাওয়া ঘাট থেকে হাওর পর্যটন শিল্পের বিভিন্ন উদ্যোক্তা, সাজেক, সেন্টমার্টিন ও রাঙামাটিসহ বিভিন্ন রিসোর্টের উদ্যোক্তারা অংশ নেন। তারা উত্তরাঞ্চলে নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনা সরেজমিনে দেখতে এ যাত্রায় যোগ দেন।
এর আগে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) মাওয়া ফেরিঘাট থেকে এ প্রমোদতরিটি যাত্রা শুরু করে রোববার সকালে চিলমারী নদীবন্দরে নোঙর করে। চিলমারী নদীবন্দরে যাত্রাবিরতি শেষে রোববার প্রমোদতরির পর্যটকরা রৌমারী উপজেলা, চর শৌলমারী তাঁতপল্লি এবং চরাঞ্চলের বিভিন্ন জনপথ ঘুরে দেখেন।
নদী ও চর ট্যুরিজমের উদ্যোক্তা রেজাউল করিম সুমন বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি—সবকিছুর সঙ্গে নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকাকে কেন্দ্র করে হাজার বছর ধরে যে বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, আমরা সে ঐতিহাসিক জলপথকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে চাই। ‘মাস্তুল’ শুধু ভ্রমণের জন্য নয়, এটি আমাদের শিকড় চিনে নেওয়ার একটি যাত্রা।’

তিনি বলেন, ‘প্রাচীন বঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে চিলমারী বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত নৌবাণিজ্য, মহাস্থানগড়ের ইতিহাস, বাহাদুরাবাদ ঘাটের ব্রিটিশ রেলওয়ে ফেরি, দেওয়ানগঞ্জের নীলকুঠির স্মৃতি—এসবকে একত্র করে নদী পর্যটনের একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা তৈরি করা সম্ভব।’
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী (ইউএনও) কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক বলেন, ‘চিলমারী নদীবন্দর ঐতিহাসিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি। ‘মাস্তুল’-এর মতো প্রমোদতরির মাধ্যমে এখানে নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের নতুন দ্বার উন্মোচিত হলো। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে।’
নদী পর্যটন-সংশ্লিষ্টদের মতে, কুড়িগ্রাম জেলার ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারসহ ১৬টি নদীর মিলনস্থলকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত নদী পর্যটন গড়ে তোলা গেলে এটি শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নয়, বরং বাংলাদেশের নদীনির্ভর সভ্যতার ইতিহাস বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করবে।
প্রমোদতরি ‘মাস্তুল’-এর উদ্যোক্তা সাকিব মাহমুদ বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লাখ লাখ পর্যটক ছুটে যায়। অথচ প্রবাহমান ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তা নদী ও চর ট্যুরিজম দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, যা এতদিন উপেক্ষিত ছিল। আমরা হাওড়ের পর্যটন তরী ‘মাস্তুল’ এবার ব্রহ্মপুত্রে নিয়ে এসেছি। আমরা এ দেশের পর্যটক ও বিদেশি পর্যটকদের কাছে চর, নদী ও গ্রামীণ জনপদের সঙ্গে পরিচিত করাতে চাই।’
রোকনুজ্জামান মানু/আরএইচ/এএসএম