বরাদ্দের চাল জেলের হাতে পৌঁছানোর আগেই ১০০ কেজি করে গায়েব
ফরিদপুরে মৎস্যজীবীদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জনপ্রতি ১৬০ কেজি চাল বরাদ্দ থাকলেও সেখানে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬০ কেজি চাল। তবে মৎস্য কর্মকর্তা ভাষ্য, এটা অনিয়ম নয়, বরাদ্দ কম আসায় এমনটি হয়েছে।
জানা গেছে, ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আট মাস জাটকা আহরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে নিষেধাজ্ঞা চলছে। সেক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত চার মাসে কার্ডধারী মৎস্যজীবী পরিবারের জন্য ১৬০ কেজি করে ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। তবে এসব চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কার্ডধারী মৎস্যজীবীদের মাঝে মাত্র ৬০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও বস্তাপ্রতি ওজনেও কম দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়নে ২৭০, চরমাধবদিয়ায় ১৩০, ডিক্রিরচরে ১১৩, আলিয়াবাদে ৮৬ জন এবং ফরিদপুর পৌরসভায় ১০০ জন কার্ডধারী মৎস্যজীবীর নামে বরাদ্দ এসেছে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার একজন প্রতিনিধি ও চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে এসব চাল বিতরণের নির্দেশনা রয়েছে।
রোববার (৮ মার্চ) দুপুরে চরমাধবদিয়া ইউনিয়ন পরিষদে মৎস্যজীবীদের মাঝে চাল বিতরণ করা হয়। তবে সেখানে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কোনো প্রতিনিধিকে পাওয়া যায়নি।

এসময় দেখা যায়, পুরোনো কার্ডধারীদের মাঝে ৩০ কেজির দুটি বস্তায় ৬০ কেজি এবং নতুন কার্ডধারীদের এক বস্তা করে চাল বিতরণ করা হচ্ছে। যার মধ্যে বেশিরভাগ চালের বস্তা কাটাছেঁড়া। তবে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ইউপি চেয়ারম্যান তড়িঘড়ি করে নতুন কার্ডধারী কয়েকজন মৎস্যজীবীকে দুই বস্তা করে চাল তুলে দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কার্ডধারী মৎস্যজীবী বলেন, আমরা নিজেরাও জানি না কত কেজি করে চাল দেওয়ার কথা। আমাদের ৬০ কেজি করে আবার তার কমও দেওয়া হচ্ছে। তবে শুনেছি ১৬০ কেজি করে দেওয়ার কথা, কিন্তু তা দেওয়া হচ্ছে না।
তারা বলেন, আমাদের অভিযোগ শোনার কেউ নেই। তাছাড়া কার কাছে অভিযোগ দিবো? তারপর আবার কার্ড বাতিল হয়ে যাবে, চালও পাবো না। তাই যা দিচ্ছে তাই নিয়েই বাড়ি যাচ্ছি। আট মাস জাটকা মাছ মারা বন্ধ, কিন্তু চাল দেওয়া হচ্ছে চার মাসের। ১৬০ কেজি দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হচ্ছে ৬০ কেজিরও কম।
সদর উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ১ হাজার ৪০০ কার্ডধারী মৎস্যজীবী রয়েছেন। এর মধ্যে ৬৫৩ জন মৎস্যজীবীর মাঝে চালের বরাদ্দ এসেছে। মোট বরাদ্দকৃত চালের পরিমাণ ১০৪ দশমিক ৪৮ মেট্রিক টন। যার মধ্যে ৬০ কেজি করে বিতরণ করায় ৬৫ দশমিক ৩ মেট্রিকটন চালের হিসাবে গড়মিল পাওয়া গেছে।
জানতে চাইলে সদরের চরমাধবদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তুহিনুর রহমান মন্ডল খোকন জানান, কার্ডধারী মৎস্যজীবীদের সংখ্যার চেয়ে চাল বরাদ্দ এসেছে কম। তাই সবার মাঝে এই চাল ভাগ করে দেওয়ায় ১৬০ কেজির জায়গায় আপাতত ৬০ কেজি করে দেওয়া হচ্ছে। মৎস্য কর্মকর্তার অনুমতি নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে ১৬০ কেজির জায়গায় মাত্র ৬০ কেজি চাল দেওয়া ঠিক কি না প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সকলের সঙ্গে কথা বলেই দেওয়া হচ্ছে। ওজনও সঠিক দেওয়া হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে ফরিদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোছা. শিরীন শারমিন খান জানান, সদরে ১৪০০ কার্ডধারী মৎস্যজীবী রয়েছেন। সেখানে ৬৫৩ জন কার্ডধারীর জন্য চালের বরাদ্দ এসেছে। কিন্তু সকলের কথা বিবেচনা করে মানবিক কারণে এই চাল সকলের মাঝেই বণ্টন করছেন চেয়ারম্যানরা। বিতরণের ক্ষেত্রে অনিয়ম বা ওজনে কম দেওয়ার বিষয়টি চেয়ারম্যানরা বলতে পারবেন।
তিনি আরও জানান, আমাদের চাল দেওয়ার বিষয়ে কোনো ক্ষমতা নেই। ডিও লেটার আসে ইউএনও অফিসে। সেখান থেকেই নির্দেশনা অনুযায়ী চেয়ারম্যানদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। চাল বরাদ্দের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার বলা হয়েছে। আমাদের জানানো হয়েছে যা বরাদ্দ পাওয়া যাবে সেভাবেই বণ্টন করতে হবে।
এন কে বি নয়ন/এফএ/এএসএম