ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

লাউয়াছড়ায় বেসামাল পর্যটক, বনে অস্থিরতা আতঙ্কে প্রাণীরা

জেলা প্রতিনিধি | মৌলভীবাজার | প্রকাশিত: ১২:০০ পিএম, ২৫ মার্চ ২০২৬

সংরক্ষিত বনের চারপাশ খোলা, বনের ভেতরে রয়েছে সড়ক ও রেলপথ। মাঝখানে বনের ভেতরে প্রবেশের জন্য মূল ফটক। টিকিট কেটে দশ শতাংশ পর্যটক ভেতরে প্রবেশ করলেও বাস্তবে বনের ভেতরে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ প্রবেশ করছেন বিনা বাধায়। ছোট একটি বনের ভেতর হঠাৎ করে একসঙ্গে এত মানুষ ভেতরে প্রবেশের ফলে বনের প্রাণীরা আতঙ্কিত।

পর্যটকরা বনের ভেতর রেললাইনে বসে আছেন বা আবার কেউ দলবেঁধে ছবি তুলছেন। হঠাৎ ট্রেন এলেই দাঁড়িয়ে শত শত মানুষ চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে ছবি তুলছেন। এখানেই পরিস্থিতি শেষ নয়, আগতরা যে যার ইচ্ছে মতো ময়লা আবর্জনা ফেলছেন বনের ভেতর। ভিআইপি কোনো অতিথি এলে মূল ফটক দিয়ে গাড়ি নিয়ে সরাসরি ভেতরে চলে আসেন। এমন বাস্তব চিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে দেখা যায়।

১২৫০ হেক্টর আয়তনের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে প্রাণীদের নিরাপদে চলাচল করার কথা থাকলে গত কয়েক বছর ধরে পর্যটকের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত পর্যটকের চাপে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয় বন এলাকার ভানুগাছ-শ্রীমঙ্গল সড়কজুড়ে। আগত পর্যটকরা নষ্ট করছেন বনের পরিবেশ। ধারণক্ষমতার বেশি পর্যটক প্রবেশ করায় বনের ভেতরের পরিবেশ নাজেহাল অবস্থা ধারণা করে। এতে ভয়ে বনের প্রাণীরাও পালিয়ে বেড়াচ্ছে। বনের ভেতর নিরবতা পালন করার কথা থাকলেও পর্যটকরা চিৎকার ও যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলাল কারণে নষ্ট হচ্ছে প্রাণীদের খাবার ও আবাসস্থল।

জানা যায়, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। ১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়াকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

লাউয়াছড়ায় বেসামাল পর্যটক, বনে অস্থিরতা আতঙ্কে প্রাণীরা

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ বলছে, ঈদের দিন শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত টিকিট কেটে উদ্যানে প্রায় ৬ হাজার পর্যটক প্রবেশ করেছেন। তবে লাউয়াছড়া বনের চারপাশ খোলা থাকায় প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যটক টিকিট ছাড়া উদ্যানে প্রবেশ করেন। পর্যটকদের নির্দেশনার জন্য বেশকিছু বোর্ড লেখা আছে। তবে বেশিরভাগ পর্যটক এই নির্দেশনা পড়লেও মেনে চলেন না। লাউয়াছড়া বনের ভেতরে প্রবেশ করার আগে অনেকেই গাজীপুর সাফারি পার্কের মতো মনে করেন এটাকে। তবে বাস্তবে এটা পুরোপুরি ভিন্ন। পর্যটকরা চিপস, চকলেট, খাবারের প্যাকেট, পানি, কোমল পানীয়র বোতলসহ ময়লা আবর্জনা ফেলে যাচ্ছেন। যা কখনো কাম্য নয়। বন ও পর্যটন একসঙ্গে দুটিকে রক্ষা করা খুবই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, বনকে পৃথিবীর ফুসফুস বলা হলেও লাউয়াছড়া বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষত-বিক্ষত করা হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। নানা সমস্যায় লাউয়াছড়া বন জর্জরিত। একদিকে বন থেকে গাছ, বাঁশ উজাড় হচ্ছে, বনের ঘনত্ব কমে এসেছে। অন্যদিক প্রাণীদের সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে। এখন অতিরিক্ত পর্যটক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বনের ভেতর সড়কপথে গাড়ির সংখ্যাও গত কয়েকবছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। যা বনের জন্য খুবই খারাপ সংকেত। শক্তভাবে বন বিভাগ এসব সমস্যা সমাধান না করলে লাউয়াছড়া নাম থাকলেও বন থাকবে না।

বন্ধুদের নিয়ে নরসিংদী থেকে আগত পর্যটক মার্জান আহমেদ বলেন, আমরা এতদূর থেকে এসেছি লাউয়াছড়া বনে শুধু বন্যপ্রাণী দেখার জন্য। তবে এখানে এসে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের দেখা মিললেও বন্যপ্রাণীর দেখা মেলেনি। এখানে বনের তুলনায় পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেশি। পর্যটক নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন মনে করেন তিনি।

লাউয়াছড়ায় বেসামাল পর্যটক, বনে অস্থিরতা আতঙ্কে প্রাণীরা

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কাজী নাজমুল হক বলেন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বনের ভেতরের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক পর্যটক আসেন বনজঙ্গল ও প্রাণী দেখার জন্য। তাদেরকে হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। এছাড়া বনের ভেতর দিয়ে চলা সড়ক ও রেলপথ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কয়েকবার বনবিভাগ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে তা কেউ মেনে চলেন না।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, বিশ্বের অন্যতম কম জনসংখ্যার ঘনত্বের দেশ ইউক্রেন, রাশিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ রয়েছে যেখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ৫ থেকে ১০ জন। সেখানে আমাদের দেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ১২০০ জন। এত অধিক সংখ্যক জনসংখ্যা থাকায় শহরের বাইরে প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখে পর্যটকরা বেসামাল হয়ে যান। অনেক পর্যটক না বুঝেই বনের ও প্রাণীদের ক্ষতি করছেন।

তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয় পৃথিবীর কোথাও চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে সেলফি তোলার জন্য কেউ ঝুঁকি নেবে না। অথচ উদ্যানের ভেতর দিয়ে ট্রেন এলেই শত শত পর্যটক সেলফি তোলার জন্য ট্রেনের একেবারে কাছে চলে আসেন। যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এর আগেও এরকম সেলফি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন পর্যটকরা। আমাদের জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। বনের পরিবেশ রক্ষার জন্য আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই।

এম ইসলাম/এফএ/এমএস