নেত্রকোনায় ১৮ পাম্পে নেই অকটেন-পেট্রোল
নেত্রকোনায় ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরা মানুষের চাপ বাড়ার মধ্যে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার ১৮টি ফিলিং স্টেশনের কোথাও পেট্রোল ও অকটেন মিলছে না। এতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
বুধবার (২৫ মার্চ) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জেলা আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল এলাকার মোনাকো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল শেষ হয়ে যায়। এর আগে ঈদের আগ থেকেই জেলার বেশির ভাগ পাম্পে অকটেন সরবরাহ বন্ধ ছিল। সর্বশেষ এই পাম্পের মজুদ ফুরিয়ে গেলে পুরো জেলাজুড়েই পেট্রোল ও অকটেন সংকট তীব্র আকার নেয়।
পাম্পগুলোতে জ্বালানি না থাকায় বাস, সিএনজি ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক চালক পাম্পে গিয়ে জ্বালানি না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষজন পড়েছেন বিপাকে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই কেন্দুয়া-নেত্রকোনা আঞ্চলিক মহাসড়কে স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় শত শত যানবাহন লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে সামান্য জ্বালানির জন্য। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি দৈনন্দিন কাজেও বিঘ্ন ঘটছে।
সংকট মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ সীমিত পরিসরে জ্বালানি সরবরাহ করছে। বৈধ কাগজপত্রধারী মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা, প্রাইভেট কারে ১ হাজার টাকা এবং জিপে ২,০০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। তবে এই সীমাবদ্ধতায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন চালকরা।
জানতে চাইলে একাধিক মোটরসাইকেল চালক জানান, ২০০ টাকার তেলে দূরে যাওয়া সম্ভব নয়। বারবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। একইভাবে পরিবহন চালকরাও বলছেন, সীমিত জ্বালানিতে স্বাভাবিক সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
কেন্দুয়া পৌর শহরের হিমালয় ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের কাছ থেকে ১১৬ টাকা লিটার দামে কেনা পেট্রোল অসাধু চক্র গ্রামাঞ্চলে ২০০-৩০০ টাকায় বিক্রি করছে। এছাড়া বাইরে থেকে আসা যানবাহনের চাপ বাড়ায় স্থানীয়দের চাহিদা পূরণ ব্যাহত হচ্ছে। তিনি দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
মোটরসাইকেল চালক শরিফ মিয়া বলেন, সরকার বলছে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ আছে, কিন্তু বাস্তবে কোথাও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। মোটরসাইকেল ছাড়া চলার উপায় নেই। এখন কী করবেন, বুঝতে পারছেন না তিনি।
আরেক মোটরসাইকেল মালিক ঝুটন মিয়া বলেন, এত দিন অকটেন না থাকায় পেট্রোল দিয়ে কোনোভাবে চলছিলেন। এখন পেট্রোলও নেই। পাম্পে অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে কীভাবে বাড়ি ফিরবেন, সেটিও জানেন না।
পাম্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে হঠাৎ চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এবং সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।
জেলা শহরের পারলা বাসস্ট্যান্ড এলাকার মোনাকো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান বলেন, সাধারণ সময়ে তাদের দৈনিক প্রায় তিন হাজার লিটার পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা থাকে। ঈদ উপলক্ষে এই চাহিদা প্রায় তিনগুণ বেড়ে যায়। গতকাল প্রায় নয় হাজার লিটার পেট্রোল বিক্রি হয়েছে। আজ সকালেই মজুত শেষ হয়ে গেছে। নতুন সরবরাহ কবে আসবে, তা নিশ্চিত নয়।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে যাত্রী পরিবহনেও। সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন বাস টার্মিনালে ভিড় বেড়েছে। টিকিট কাউন্টারগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে টিকিট পাচ্ছেন না। অনেক বাস নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে ছেড়ে যাচ্ছে, আবার যানবাহনের সংখ্যাও কমে গেছে। ফলে কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে।
কেউ অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বিকল্প যানবাহনে যাচ্ছেন, আবার কেউ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বাস পাচ্ছেন না। অনেকে ট্রাক, পিকআপ, লেগুনা ও সিএনজিতে করে গন্তব্যে রওনা দিচ্ছেন।
দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে জেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়েছে। সদর উপজেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ও বাসস্ট্যান্ডে এ তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহেদুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে শহরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের মজুদ পরিমাপ করা হয়। বিক্রয় রেজিস্টারসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও যাচাই করা হয়। পাম্প মালিকদের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এম কামাল/আরএইচ