বাগেরহাট
দুই বংশের সংঘর্ষে যুবক নিহত, অগ্নিসংযোগে ৪০ বসতবাড়ি ভস্মীভূত
বাগেরহাটের চিতলমারীতে আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ব শত্রুতার জেরে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে রাজীব শেখ (২৫) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। এছাড়া এ ঘটনায় অন্তত ৪০টি বাড়িঘর ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত উপজেলার চিংগড়ী গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে,দীর্ঘদিন ধরে মধুমতি চরের জমি দখল নিয়ে আলম শেখের সঙ্গে বিশ্বাস বংশের বিরোধ চলে আসছিল। এই বিরোধের জেরে বিশ্বাস বংশের সদস্যরা আলম শেখকে হত্যা করে। হত্যার পরেও থামেনি দুই পরিবারের বিরোধ। এই বিরোধের এর আগেও কয়েকবার দুই পক্ষের মধ্যে ছোটোখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই বিরোধে এখন পর্যন্ত তিনজন নিহত হয়েছে।
এই বিরোধের জের ধরে বৃহস্পতিবার বিকেলে আরিফ শেখ নামে এক যুবককে বিশ্বাস পরিবারের লোকজন মাছ ধরার বিষাক্ত অস্ত্র ‘ফুলকুচি’ দিয়ে আঘাত করলে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে তা রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। অভিযোগ উঠেছে, সাইদ বিশ্বাস ও ইউপি সদস্য সোহাগের নেতৃত্বে দুই শতাধিক মানুষ শেখ বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট করে এবং পেট্রোল ও বিটুমিন ঢেলে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। অন্তত ৪০টি বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত রিপন শেখ জানান, আমার দুই ভাই বিদেশে থাকে, অনেক কষ্টে দোতলা ঘর তুলেছিলাম। হামলাকারীরা সোনা ও মালামালসহ প্রায় দেড় কোটি টাকার সম্পদ লুটে নিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত লিয়াকত শেখ বলেন, আগুন দিয়ে আমার সব কিছু শেষ করে দিয়েছে। কি খাব আর কি করব কিছুই জানি না। আমার ছেলে বা আমি তো কারও সঙ্গে মারামারি করতে যাইনি, তাহলে আমার ঘর কেন পোড়ালো?
মনোয়ারা বেগম নামের এক নারী বলেন, আমার স্বামী প্যারালাইজড (পক্ষাঘাতগ্রস্ত) বিছানায়। মারামারির ভয়ে ছোট ছেলেকে ঢাকায় পাঠিয়েছি, আর বড় ছেলে ভ্যান চালায়। ঋণ করে ৬ মাসের ধান কিনে রাখছিলাম ঘরে। তাও পুড়ে গেছে। কি খাব জানি না।
আব্দুর গণি শেখের স্ত্রী জয়নব বেগম বলেন, ঘর ঠিক করার জন্য ৫০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলাম। তা নিয়ে গেছে। একটি ছাগল ও কয়েকটা হাঁস ছিল, তাও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কীভাবে বাঁচব জানি না। হামলাকারীদের বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন এই নারী।
এদিকে শুক্রবার দুপুরের দিকে দেখা যায়, শেখ পরিবারের সদস্যদের হামলার আশঙ্কায় মচন্দপুর গ্রামের বিশ্বাস বাড়ি থেকে টিভি, ফ্রিজ, খাটসহ বিভিন্ন মূল্যবান আসবাবপত্র ভ্যান, নসিমন ও পিকআপে করে আত্মীয় স্বজনের বাড়ি পাঠাচ্ছেন। তাদের দাবি, শেখ পরিবারের লোকজন সংগঠিত হচ্ছে, তারা আমাদের বাড়িতে হামলা করবে। আলম শেখ মারা গেলেও এমন হামলা করেছিল।
পান্না বিশ্বাসের স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, কয়েক বছর আগে আমার স্বামীকে মেরে পঙ্গু করে দিয়েছে শেখ পরিবারের লোকজন। তাদের ভয়ে আমরা সব মালামাল নিরাপদ স্থানে পাঠাচ্ছি। আমাদের তো বাঁচতে হবে। ওরা হুমকি দিয়েছে, সবকিছু পুড়িয়ে দেবে। আগেরবারও আমাদের সবকিছু পুড়িয়ে দিয়েছিল।
অভিযুক্ত স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. সোহাগ বলেন, বিশ্বাস বংশ হামলা করেছে ঠিক, কিছু কাউকে হত্যা করেনি। তারা নিজেরা নিজেদের লোককে হত্যা করে দোষ চাপাচ্ছে।

এদিকে হামলা, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও নিহতের ঘটনায় সৌরভ বিশ্বাস (১৯) নামের একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সৌরভ মচন্দপুর গ্রামের সোহেল বিশ্বাসের ছেলে।
বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. শামীম হোসেন বলেন, অনেক বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে এবং রাজিব নামে এক যুবক নিহত ও অনেকে আহত হয়েছেন। নিহত রাজিবের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করতে অভিযান শুরু করেছে।
তিনি আরও বলেন, ফের সংঘর্ষ বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
চিতলমারী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে আসি। তবে বাধার সম্মুখীন হওয়ায় আগুন নেভানোর কাজ শুরু করতে কিছুটা বিলম্ব হয়। আমরা চারটি ইউনিট একযোগে কাজ করে ৩ ঘণ্টায় চেষ্টায় আগুন নেভাতে সক্ষম হই।
নাহিদ ফরাজী/কেএইচকে/এএসএম