আগাম বন্যার ঝুঁকি, হাওরে বোরো নিয়ে শঙ্কা
আগাম বন্যার ঝুঁকি থাকায় নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের কৃষকরা বোরো ফসল নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। ছবি-জাগো নিউজ
খালিয়াজুরীর জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক ওয়াসিম মিয়া (৪৩) এবার হাওরের ১৫ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। পুরো পরিবারের খাওয়া-দাওয়া, বাচ্চাদের লেখাপড়া, চিকিৎসাসহ সব খরচ আসে বছরের এই একমাত্র ফসল বোরো ধান থেকে। কিন্তু গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি, ঝড়, শিলাবৃষ্টি তাকে দুচিন্তায় ফেলে দিয়েছে। আবহাওয়ার এ অবস্থার কারণে রীতিমতো আতঙ্কে তিনি।
ওয়াসিম মিয়া বলেন, ‘প্রথম দিকের হালকা বৃষ্টি ফসলের জন্য ভালো ছিল। পরে অতিবৃষ্টিতে হাওরে পানি জমে গেছে। কয়েক দফা শিলায় ধানের ক্ষতি হয়েছে। এখন যদি আরও বৃষ্টি হয়, আগাম বন্যা হয়, তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।’
শুধু ওয়াসিম মিয়া একা নন, নেত্রকোনার হাওর এলাকার অনেক কৃষকই তাদের জমির ফসল নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন। অনেকে আতঙ্কে আছেন। ভারী বৃষ্টিতে অনেক ফসল রক্ষা বাঁধে ফাঁটল দেখা দিচ্ছে। এতে ঝুঁকিতে পড়তে পারে হাওরের একমাত্র এই বোরো ফসল।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, আগামী এক সপ্তাহ নেত্রকোনায় হালকা ও মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। এতে নদ-নদীর পানি কিছুটা বাড়বে। এরইমধ্যে নেত্রকোনায় গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে বিভিন্ন হাওরের নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাপক শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে ক্ষতি হয়েছে বোরো ধানের।

কলমাকান্দার পোগলা ইউনিয়নসহ কোনো কোনো এলাকায় সেচের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন কৃষকরা। আবার পাহাড়ি ঢল ও অকাল বন্যার আশঙ্কায় হাওরের বাঁধ কাটতেও ভয় পাচ্ছেন অনেকে।
কৃষকরা বলছেন, হাওরে বোরো ধানের গাছে এখনো থোড় (চাল) আসেনি। গাছগুলো এখনো নরম। এ অবস্থায় শিলাবৃষ্টিতে ধানগাছের ক্ষতি হয়েছে বেশি। আবার ভারী বৃষ্টিতে পানি জমে জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় ধানগাছের নিচটা পচে যেতে পারে।
মোহনগঞ্জের গাগলাজুর এলাকার কৃষক কাজল চৌধুরী বলেন, এই বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির পানি খুবই ঠান্ডা। গাছের গোড়াতে বেশি দিন থাকলে গাছ পচে যাবে। শিলাবৃষ্টিতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা রোদ উঠলে কয়েকদিন পর পুরোটা বোঝা যাবে।
তিনি বলেন, ‘সব হাওরেই ডুবরা (জলাবদ্ধতা) আছে। যদি আরও বেশি মেঘ (বৃষ্টি) অয়, তাইলে ক্ষতি বাড়বো। এখন ডর বন্যা লইয়া।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতিবৃষ্টিতে জেলার মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা, চরহাইজদা, চন্দ্রাসোনারতাল, শয়তানখালী, খালিয়াজুরী উপজেলার কীর্তনখলা, পাঙ্গাসিয়া, কটিচাপড়া, লক্ষ্মীপাশা, বোয়ালী, জগন্নাথপুর, বিলবিল্লিয়া, হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে কমবেশি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

খালিয়াজুরী সদরের পুরানহাটি গ্রামের বাসিন্দা কৃষক শামসুল হক বলেন, ‘হাওরে একদিকে পানি আছে, অন্যদিকে নেই। বাঁধের কাজও এবছর ভালো হয়নি। বৃষ্টিতে কিছু কিছু বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। কৃষকেরা দুচিন্তায় আছেন। বছরের একমাত্র ফসলের ক্ষতি হলে এর দায় প্রশাসন ও পাউবোকে নিতে হবে।’
নীতিমালা অনুযায়ী, পাউবোর তদারকিতে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পিআইসি গঠন ও ৩০ অক্টোবরের মধ্যে প্রকল্প নির্ধারণের কাজ চূড়ান্ত হওয়ার কথা। আর হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের নির্মাণকাজ ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে শুরু এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তা শেষ করার কথা রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সময়ে এবছর বাঁধে মাটি কাটার কাজ শেষ করতে পারেনি পাউবো। দেরিতে বাঁধে মাটি কাটায় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে হাওরের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির ফসল।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানায়, জেলায় পাউবোর অধীনে প্রায় ৩৬৫ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ আছে। এবছর ১৩৭ দশমিক ৫৭৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করতে ২০২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কিমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়েছে। এর বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। গঠিত ২০২টি পিআইসির মধ্যে খালিয়াজুরিতে ১৪৩টি, মোহনগঞ্জে ২৯টি, মদনে ১৯টি ও কলমাকান্দায় ১০টি রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একসময় ঠিকাদারের মাধ্যমে হাওরে বাঁধ মেরামত করা হতো। কিন্তু ২০১৭ সালের অকাল বন্যায় বাঁধ ভেঙে ফসলহানির পর পাউবোর কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। পরে ঠিকাদারি বাতিল করে পিআইসি ব্যবস্থা চালু করা হয়। উপজেলা কমিটির সভাপতি স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সদস্য সচিব পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী। আর জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক, পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী কমিটির সদস্য সচিব।
স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে কমিটির সদস্য হবেন ৫-৭ জন। এসব কমিটি হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ পুনর্নির্মাণ ও মেরামতের কাজ করবে। প্রতিটি প্রকল্পে কাজের বিপরীতে পাঁচ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এ সাতটি জেলায় দেশের মোট উৎপাদনের ২০ শতাংশ বোরো চাষ হয়। এবছর কৃষকরা ৯ লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ করেছেন, কিন্তু ফসলগুলো এখন ফুল আসার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, গত চার দিনে সিলেট অঞ্চলে ২০০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ২৩ মার্চের মধ্যে আরও ২০০-৩০০ মিমি বৃষ্টিপাত হতে পারে। মার্চের জন্য এমন আগাম ও তীব্র বৃষ্টিপাত অস্বাভাবিক, যা আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ভারতের মেঘালয় ও আসাম থেকে আসা পাহাড়ি ঢল হাওর অববাহিকায় প্রতিবছরই এ ধরনের হুমকি সৃষ্টি করে।
ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। বাঁধগুলোর কাজ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। সময়সীমা বাড়ানোর পরেও অনেক এলাকায় কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, যা ২০১৭ এবং ২০২২ সালের বিধ্বংসী বন্যার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) মতে, সুরমা-কুশিয়ারা এবং ধনু-বাউলাই নদীর পানি বাড়ছে, যদিও তা এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। আগামী কয়েক দিন হাওর অববাহিকায় আরও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেনের বলেন, ‘হাওরের সবগুলো বাঁধেই মাটি কাটার কাজ শেষ হয়েছে। বাঁধে ঘাসও লাগানো হয়েছে। এসময়ে সামান্য বৃষ্টিপাত হলেও বন্যার শঙ্কা নেই। আগাম বৃষ্টিপাতে কিছু বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছিল। তবে সেগুলো দ্রুত সংস্কার করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি খন্দাকার মুশফিকুর রহমান বলেন, হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে সর্বোচ্চ তদারকি করা হচ্ছে। প্রতিটি বাঁধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কৃষকের বোরো ফসল নির্বিঘ্নে ঘরে তুলতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এইচ এম কামাল/এসআর/এমএস