জ্বালানি সংকটে কুয়াকাটায় পর্যটক খরা
জ্বালানি সংকট ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধের প্রভাবে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় দেখা দিয়েছে পর্যটক খরা। সপ্তাহের সবচেয়ে ব্যস্ত দিন (১০ এপ্রিল) শুক্রবারও কাঙ্ক্ষিত পর্যটকের দেখা মেলেনি। ফলে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, জ্বালানি সংকটের কারণে প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে পুরো এলাকা দ্রুত অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। এতে করে পর্যটকদের অবস্থানকাল কমে যাচ্ছে এবং রাতের অর্থনৈতিক কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের জিরো পয়েন্ট, লেম্বুরবন, গঙ্গামতি, কাউয়ারচর ও রাখাইন মার্কেট সবখানেই পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল একেবারে কম। সাধারণত ছুটির দিনে যেখানে পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে, সেখানে ছিল নীরবতা।
পর্যটক কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। সৈকতে বসে থাকা ফটোগ্রাফার, খাবারের দোকানদার, মোটরসাইকেল চালকরা সবারই একই চিত্র।

সৈকতের ফটোগ্রাফার আব্দুর রহিম বলেন, আগে শুক্রবার মানেই ছিল আমাদের জন্য ব্যস্ত সময়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্যামেরা নিয়ে দৌড়াতে হতো। দিনে অন্তত ২০-৩০ জন পর্যটকের ছবি তুলতাম। এখন পুরো দিন বসে থাকলেও ৪-৫ জন কাস্টমারও পাই না। অনেক সময় একেবারেই কাজ থাকে না। আয় না থাকায় সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে গেছে। ক্যামেরার কিস্তি, পরিবারের খরচ সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
আচার ব্যবসায়ী রাসেল রুম্মান বলেন, আমাদের ব্যবসা পুরোপুরি পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। আগে ছুটির দিনে একদিনে যত বিক্রি হতো, এখন সেটা সপ্তাহেও হচ্ছে না। দোকান খুলে বসে থাকি, কিন্তু ক্রেতা আসে না। অনেক সময় পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে। যদি এই অবস্থা আরও কিছুদিন চলে, তাহলে হয়ত ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবো।
কুয়াকাটা সিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড বিলাসের এজিএম আল আমিন উজ্জ্বল বলেন, আমাদের রিসোর্টের মোট রুম সংখ্যা দু’শোর ওপরে, যার ৮০ শতাংশ পর্যটক পেতাম ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে আসা। শুক্রবার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে আসা পর্যটকের সংখ্যা একেবারে শূন্যের কোটায়। শুক্রবার যেখানে আমাদের কমপক্ষে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়ে যায়, সেখানে রুম বুকিং পেয়েছি মাত্র ১৫-২০ শতাংশ। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ থাকবে না।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইব্রাহিম ওয়াহিদ বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে পর্যটক কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আমাদের ওপর। হোটেলগুলোতে বুকিং কমে গেছে, অনেক কক্ষ খালি পড়ে আছে। ফলে কর্মচারীদের কাজও কমে গেছে। অনেকেই আগের মতো বেতন পাচ্ছেন না, কেউ কেউ চাকরি হারানোর শঙ্কায় আছেন। এই খাতের সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষের জীবিকা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, কুয়াকাটার পর্যটন খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। পর্যটক না থাকায় হোটেল পরিচালনার খরচ তুলতে পারছি না। বিদ্যুৎ, স্টাফ বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ সবকিছু চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যদি দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তাহলে অনেক বিনিয়োগকারী বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবেন এবং ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হবে।
আসাদুজ্জামান মিরাজ/এফএ/এএসএম