ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

জনবল সংকট-অর্থ বরাদ্দে আটকা রংপুরের শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম

জিতু কবীর | প্রকাশিত: ০৬:১৭ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

রংপুরবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ১০০ শয্যার আধুনিক শিশু হাসপাতালটি নির্মাণের ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। তবে আজও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি হাসপাতালটি। জনবল সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতার ‘অজুহাতে’ থমকে আছে হাসপাতালের কার্যক্রম। ফলে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েই চলেছে।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রংপুর সিটি করপোরেশনের সামনে সদর হাসপাতালের ১.৭৮ শতাংশ জমির ওপর উত্তরবঙ্গের প্রথম সরকারি ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ৩১ কোটি ৪৮ লাখ ৯২ হাজার ৮০৯ টাকা।

প্রকল্পের কাজ শেষ করতে দুই বছরের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের আড়াই মাস আগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাজ শেষে শিশু হাসপাতাল ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা সিভিল সার্জনকে হস্তান্তর করা হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২০ সালের প্রথম দিকেই শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম শুরুর কথা ছিল। তবে বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে থমকে যায় সব কার্যক্রম।

২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে শিশু হাসপাতালটিতেই করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু হয়। আর এতেই পিছিয়ে যায় শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম।

জনবল সংকট-অর্থ বরাদ্দে আটকা রংপুরের শিশু হাসপাতাল

রংপুরের স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, তিনতলা মূল হাসপাতাল ভবনের প্রতি তলার আয়তন ২০ হাজার ৮৮২ দশমিক ৯৭ বর্গফুট। সিঁড়ি বাদে প্রতি তলার আয়তন দেড় হাজার বর্গফুট। ছয়তলা ডক্টরস কোয়ার্টারের নিচতলায় গাড়ি পার্কিং, দ্বিতীয় তলা থেকে ডাবল ইউনিট। আছে ছয় তলাবিশিষ্ট স্টাফ অ্যান্ড নার্স কোয়ার্টার। দুই তলাবিশিষ্ট গ্যারেজ কাম ড্রাইভার কোয়ার্টার। নিচে দুটি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। বিদ্যুৎ সাবস্টেশন স্থাপনের জন্যও নির্মাণ করা হয়েছে একটি ভবন।

শিশু হাসপাতালের মূল ভবনের প্রথম তলায় থাকবে ইমার্জেন্সি, আউটডোর, চিকিৎসকদের চেম্বার এবং ল্যাব। দ্বিতীয় তলায় অপারেশন থিয়েটার, ব্রোন ইউনিট এবং তৃতীয় তলায় ওয়ার্ড এবং কেবিন থাকবে।

আরও পড়ুন:
সন্দেহ ও বাস্তবতার ফারাক, হামের প্রকৃত রোগচিত্রে অস্পষ্টতা
চাঁপাইনবাবগঞ্জে হাম উপসর্গ নিয়ে একদিনে হাসপাতালে ভর্তি ৫০ শিশু
লাইসেন্স ছাড়াই ৮ বছর ধরে চলছে প্রাইভেট হাসপাতাল, অবশেষে সিলগালা
‘রিকশা চালাইয়া যে টেহা জমাইসিলাম মেয়ের সিজারে সব খরচ হইয়া গেছে’

তিনতলা এ ভবনে জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, ওয়ার্ড, কেবিন এবং চিকিৎসকদের আবাসনসহ সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে হাসপাতালের বেশিরভাগ কক্ষই অব্যবহৃত পড়ে আছে।

শিশু হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় পুরো বিভাগের শিশুদের চিকিৎসার ভার পড়ছে রমেক হাসপাতালের ওপর। সেখানে ১০৮টি শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ২০০-৩০০ শিশু ভর্তি থাকছে। শয্যা সংকটে অনেক শিশুকে হাসপাতালের বারান্দায় বা মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

‘হাসপাতালের বহির্বিভাগে এখন ৪০-৫০ জন শিশু চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হলে এ অঞ্চলের শিশুরা উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছে না’—চিকিৎসক

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ৮ মার্চ সিভিল সার্জনকে হাসপাতাল ভবনটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক অনুমোদন, জনবলের পদ সৃষ্টিসহ প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ছাড়াই তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন।

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৫ জুন ৬৫৯ জনবল নিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। রংপুরের তৎকালীন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক আবু হানিফ এ চিঠি দেন। হাসপাতালের পেছনে বছরে ৪৬ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৬৩৮ টাকা ব্যয় হবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি শিশু হাসপাতালে অস্থায়ীভাবে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের বর্ধিত শিশু বহির্বিভাগ চালুর নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। পরে ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি হাসপাতাল ভবনের নিচতলার তিনটি কক্ষে শিশু বহির্বিভাগ করা হয়। শুধু টিকিট কেটে চিকিৎসক দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, কিন্তু সেখানে রোগী ভর্তির কোনো সুযোগ নেই।

জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্র জানায়, শিশু হাসপাতালটিতে একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা ও চারজন কনসালট্যান্ট প্রেষণে সংযুক্ত আছেন। প্রতিদিন চিকিৎসা কর্মকর্তা ও একজন কনসালট্যান্ট সকাল ৯টা থেকে থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত রোগী দেখেন।

জনবল সংকট-অর্থ বরাদ্দে আটকা রংপুরের শিশু হাসপাতাল

শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগের চিকিৎসক আমাতুল্লা নাসিরা জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাসপাতালের বহির্বিভাগে এখন ৪০-৫০ জন শিশু চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হলে এ অঞ্চলের শিশুরা উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছে না।’

আরও পড়ুন:
চিকিৎসকের কাছে যুবদল পরিচয়ে চাঁদা দাবির ঘটনায় মামলা
৫ আগস্টের পর থেকেই ডিস্টার্ব করতেন যুবদল নেতা মঈন উদ্দিন: ডা. কামরুল
কর্মস্থল খাগড়াছড়িতে, চিকিৎসা সেবা দেন টাঙ্গাইলের ক্লিনিকে ক্লিনিকে
নীলফামারীতে খুব শিগগির হাজার শয্যার হাসপাতালের কাজ শুরু: সচিব

নগরীর আদর্শপাড়া এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী আবিদা সুলতানা বলেন, ‘বছরের প্রায় সময়ই শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত অভিভাবকদের চিকিৎসার একমাত্র স্থান রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু সেখানেও প্রায়ই সময় রোগীর চাপ থাকে। ফলে অনেক সময় মনমতো সেবা পাওয়া যায় না। ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল চালু হলে স্বল্প খরচে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হতো বলে মনে করি।’

‘গত বছরের ৫ অক্টোবর ১০০ শয্যার সেবা কার্যক্রম চালুকরণে অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। কিন্তু জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় এর কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। হাসপাতাল চালু না হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ জেলা উন্নয়ন কমিটির সভায় একাধিকবার তুলে ধরা হয়েছে’—সিভিল সার্জন

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, হাসপাতালটি চালু করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে কয়েকবার চিঠি দেন জেলা সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য)। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ হাসপাতালটি চালু করতে পরিদর্শন প্রতিবেদন চায়। এরপর একাধিকবার সুপারিশসহ প্রতিবেদন পাঠানো হয়।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত বছরের ৫ অক্টোবর ১০০ শয্যার সেবা কার্যক্রম চালুকরণে অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। কিন্তু জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় এর কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না।
হাসপাতাল চালু না হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ জেলা উন্নয়ন কমটির সভায় একাধিকবার তুলে ধরা হয়েছে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলার সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিশুদের জন্য আলাদা বিশেষায়িত হাসপাতাল হলে এ অঞ্চলের মানুষ অনেক উপকৃত হবেন। বেসরকারি হাসপাতালে অনেকের চিকিৎসা ব্যয় বহনের সামর্থ্য থাকে না। তবে দীর্ঘদিনেও কেন এ হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হলো না, এতে কার গাফিলতি—তা খতিয়ে দেখা হোক।’

এসআর/এমএস