একজন পাখি প্রেমিকের গল্প
ক্যামেরার সঙ্গে সখ্যতার সময় থেকেই তার প্রণয় গড়ে ওঠে এদেশের শ্যামল প্রকৃতির চপল পাখিদের সঙ্গে। তাই গত ৭-৮ বছর ধরে অনেক কিছুর ছবি তুললেও পাখি রয়েছে এক বিশাল জায়গাজুড়ে।
‘আমি পাখি ভালোবাসি। পাখি নিয়ে ব্যাপক পড়াশোনাও করি। পাখিকে আমি চিনি, পাখি আমাকে চেনে। এখনো বাতাসে উড়ে যাওয়া একটা সাধারণ হাঁস দেখে আমি বলে দিতে পারি তা কোন প্রজাতির, কোথায় থাকে, কী খায়, পাখির সঙ্গে আমার এই ভালোবাসার জন্যই আমার ছবির বিশাল অংশজুড়ে পাখি।’
পাখি নিয়ে নিজের গভীর আবেগ এভাবেই তুলে ধরলেন পাখিপ্রেমিক ঠাকুরগাঁও শহরের তরুণ ব্যবসায়ী রেজাউল হাফিয রাহী।
রাহী জানান, পাখির ছবি তোলার শখ তার অনেক দিনের। কিন্তু সে তো আর খুব একটা সহজ কাজ নয়। কারণ পাখি তো আর এক জায়গায় বসে থাকে না। তবে ছবি তুলতে তুলতে ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, কিছু পাখি আছে যা এক রকম আমাদের বাড়ির লোকই হয়ে গেছে। তাদেরও একটা পাড়া আছে, তার বাইরে বেশি যায় না এবং ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলে তাদের সুন্দর ছবিও তোলা যায়।
তিনি আরো জানান, আমি ঠাকুরগাঁও বুড়ির বাঁধ এলাকা থেকে কমন মারগেঞ্জার নামের দুটি পাখির ছবি তুলি। সেই ছবি দিয়ে পাখিটি প্রথম বাংলাদেশে রেকর্ড করা হয়। আর এই ছবির জন্য আমাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরস্কৃত করা হয়।
ঠাকুরগাঁও শহরের হাজিপাড়ায় রাহীর বাসা। ঠাকুরগাঁও ইলেকট্রনিক্স নামে ঠাকুরগাঁও চৌরাস্তায় তার একটি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ব্যবসার কাজে হাজারো ব্যস্ততার মাঝে প্রতি শুক্রবার তিনি তার সহযোগীদের নিয়ে বের হন ছবি তুলতে। বিভিন্ন বন-জঙ্গল ঘুরে বিলুপ্ত ও অচেনা পাখিদের ছবি তোলেন। নিজের ক্যামেরার মাধ্যমে পাখিদের সৌন্দর্য তুলে ধরেন মানুষের কাছে।
ছবি তোলার পাশাপাশি পাখি রক্ষণাবেক্ষণ করেন তিনি। বন্দি খাঁচার পাখিদের মুক্ত আকাশে উড়িয়ে দিতে ভালোবাসেন। কেউ যদি পাখি শিকার করে তবে তিনি পাখি শিকারিদের অনুরোধ করেন পাখি শিকার না করার জন্য। 
দেশীয় পাখি কেউ মারবেন না, ধরবেন না এমনকি পুষবেন না এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করলেন রাহী। এজন্য ঠাকুরগাঁওয়ের অনেকে তাকে পাখি ভাই বলে ডাকে আর সেটা তার কাছে ভালোই লাগে।
ঠাকুরগাঁওয়ের পাখিপ্রেমী রাহী প্রায় ১৭০ প্রজাতির পাখির ছবি তুলেছেন। দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় তার তোলা ছবি প্রকাশ করাও হয়েছে অনেকবার। এছাড়াও ২০১২-২০১৩-২০১৪ সালে ফটো এক্সিবিশনে পদক পেয়েছেনও তিনি।
পাখির ছবির মধ্যে রয়েছে- দেশি পাখির তালিকায় হড়িয়াল, নীলকণ্ঠী, হলদে পাখি, গো-বক, ভাত শালিক, কাঠ-শালিক, বড় ঝুঁটি বুলবুলি, বাতাবি কাঠ ঠোঁকরা, ছোট মাছরাঙা, শঙ্খচিল, হুতোম প্যাঁচা।
অন্যদিকে পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে চখা-চখি, মেটে হাঁস, ভূতি হাস, নিশির, কালো গলা মানিক জোড়, কালো শির রাজহাঁস। সেদিক থেকে বিদেশি পাখিরাও কম যায়নি।
পেশার খাতিরে নানা দেশে ঘুরতে হয়েছে তাকে। বিদেশি পাখিদের তালিকাটা তাই অলংকৃত করেছে ইয়েলো হুডেড ব্লাকবার্ড। গ্লুসি এমারেল্ড স্টারলিং, ব্লু স্ট্রিকড রেড লরি, অ্যামেরিকান ফ্লেমিঙ্গো, উড ডাক, অস্ট্রিচ, নিকোবার পিজিওন, ভিক্টোরিয়া ক্রাউনড পিজিওন, বালি ময়না প্রভৃতি বিভিন্ন জাতের আর বিচিত্র সাজের পাখি।
এছাড়াও ছবি সংক্রান্ত নানা বিষয়েই তার উৎসাহ। এদেশের আলোকচিত্রী এবং তাদের মান নিয়ে গর্বিত তিনি।
‘এ দেশের আলোকচিত্রের মান বিশ্বমানের। দুই বছর অন্তর অন্তর হওয়া ছবিমেলা সেটারই প্রমাণ। আমাদের আলোকচিত্রীরা বহির্বিশ্ব থেকে অনেক পুরস্কার, অনেক সম্মান কুড়িয়ে আনছেন। এটা নিঃসন্দেহে গর্ব করার মতো বিষয়।’ জানালেন পাখি প্রেমিক রেজাউল হাফিয রাহী।
এসএস/আরআইপি