ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

রাঙামাটির প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে দেয়া হচ্ছে ভুল চিকিৎসা

প্রকাশিত: ০২:৫৩ এএম, ০৩ অক্টোবর ২০১৬

রাঙামাটির প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত আর্থিকসহ নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের।               

অনুসন্ধানে জানা যায়, শহরসহ রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন উপজেলা সদরে রয়েছে ক্লিনিক, প্যাথলজিক্যাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাব ও হাসপাতালসহ বহু প্রাইভেট ক্লিনিক। শুধু শহর এলাকায় এসব ক্লিনিকের সংখ্যা অন্তত অর্ধ শতাধিক বলে জানা গেছে।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু ক্লিনিকের বৈধ লাইসেন্স থাকলেও অনেকগুলো চলছে লাইসেন্স ছাড়াই। বৈধ-অবৈধ সবকটি ক্লিনিক চলে নিজেদের খেয়াল খুশিমতো। সেগুলোয় চিকিৎসার নামে চলছে রমরমা বাণিজ্য। হাতানো হচ্ছে মোটা অংকের অর্থ। সেই সঙ্গে দেয়া হচ্ছে ভুল চিকিংসাও

ভূক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, রাঙামাটির প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোয় চিকিৎসার নামে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়া হলেও তার বিপরীতে তারা খেলছে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি।  

এদিকে, জেলা সিভিল সার্জন অফিসের দেয়া তথ্যে দেখা যায়, শহরসহ রাঙামাটি জেলায় বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডেন্টাল ক্লিনিক ও ব্লাড ব্যাংক মিলে কেবল ২৫টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভূক্ত রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটির লাইসেন্স নেই। কয়েকটির লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েও নবায়নের জন্য আবেদন করা হয়নি।

তালিকাভূক্ত এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০ শয্যার লংগদুর রাবেতা হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং শহরের ১০ শয্যার বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতির হাসপাতাল, অভিকস ডেন্টাল সার্জারি ও প্রলিনস ওরো ডেন্টাল সার্জারির কোনো রকম বৈধ কাগজ বা লাইসেন্সের তথ্য দেখা যায়নি।

১৯৮০ সালে জেলার লংগদু উপজেলার মাইনিমুখে স্থাপিত রাবেয়া হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফুল্ল্যাহ বলেন, হাসপাতালটি চালু হয় এনজিওর মাধ্যমে। পরে জেলা সিভিল সার্জনের মাধ্যমে নিবন্ধনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরে কাগজপত্র দাখিল করা হয়েছে। তাদের হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয় লোকজন সেখান থেকে এ যাবৎ প্রতিনিয়ত চিকিৎসা নিচ্ছেন।  

এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, ওইসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিয়মমতো চলে। অনুমোদন নেয়ার জন্য সিভিল সার্জন অফিস থেকে একাধিকবার চিঠি দেয়া হয়েছে।

তথ্যমতে দেখা যায়, কাপ্তাই চন্দ্রঘোনার ৫০ শয্যার খ্রিষ্টিয়ান হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ ২০১২ সালের ৩০ জুন শেষে বর্তমানে নবায়নের জন্য আবেদন করা আছে। রাঙামাটি শহরের উত্তর কালীন্দীপুরে স্থাপিত ৬ শয্যার লেক সাইট হাসপাতালের মেয়াদ ২০১৫ সালের ৩০ জুন শেষ হয়ে আবার নবায়নের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

নানা অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে লেক সাইট হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পলাশ বলেন, তারা অনিয়ম কিছুই করেন না। তাদের ক্লিনিকে রোগীদের উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করা আছে শহরের শেভরণ অ্যান্ড ডক্টরস ল্যাব, হিল ফ্লাওয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মীম প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি, মেডিনেট ল্যাব, সাগরসুধা প্যাথলোজিক্যাল ল্যাবরেটরি, হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক ও ডায়াবেটিক সেন্টার, তৌশী ডায়াগনস্টিক সেন্টার, জনতা প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি, সূর্যের হাসি ক্লিনিক, রাঙ্গামাটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

Rangamati

আরো রয়েছে তবলছড়ির নিরঞ্জন ঊষা প্যাথলজি সেন্টার, বন্ধন প্যাথলজিক্যাল, বনরূপা ডেন্টাল কেয়ার, পিকাসু ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরের হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কাপ্তাই উপজেলার বরইছড়ির মেনোকা প্যাথলজি ও নতুন বাজারের হিলভিউ ল্যাবরেটরি সেন্টার।

শহরের বনরূপা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলেও নবায়নের জন্য আবেদন করা হয়নি। তবে বিষয়টির ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বনরূপা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সত্ত্বাধিকারী এমদাদুল ছালেম বলেন, তাদের বৈধ কাগজপত্র আছে। লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদনও করা হয়েছে।

এসব প্রাইভেট ক্লিনিক, চিকিৎসা ও প্যাথলজি ছাড়াও বিভিন্ন নামে শহরসহ বিভিন্ন উপজেলায় গড়ে উঠেছে ব্যাঙের ছাতার মতো ক্লিনিক ও প্যাথলজি যেগুলো চলছে কোনো লাইসেন্স ছাড়া এবং নিজেদের ইচ্ছেমাফিক। জেলা সিভিল সার্জন অফিসে সেগুলোর তালিকাও নেই।   

অন্যদিকে রাঙামাটি শহরে রয়েছে ১শ’ শয্যার সরকারি জেনারেল হাসপাতাল। এছাড়া রয়েছে সরকারি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা কেন্দ্র ১০ শয্যার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র, সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা স্বাস্থ্য ক্লিনিক, স্কুল হেলথ ক্লিনিক, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, পুলিশ হাসপাতাল ও ডায়াবেটিকস সমিতি হাসপাতাল। জেলার অন্য ৯ উপজেলায় প্রতিটিতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ কয়েকটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ক্লিনিকও রয়েছে।

পাশাপাশি রয়েছে ২৭টি কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক সেন্টার। তবে শহরের জেনারেল হাসপাতাল এবং মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো ছাড়া অন্য ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোয় রোগী ভর্তি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। কেবল বহির্বিভাগে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। আর স্কুল হেলথ ক্লিনিকটি কার্যত অচল। নানা অনিয়ম অব্যস্থাপনার কারণে সেখানে সেবা নিতে যান না কেউ।

Rangamati

দেখা যায়, জেনারেল হাসপাতালসহ ওইসব সরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ে আধুনিক প্রযুক্তির উন্নত যন্ত্রপাতি এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জামাদি না থাকায় জীবন বাঁচানোর তাগিদে রোগীদের প্রতিনিয়ত ছুটতে হয় প্রাইভেট ক্লিনিক, ল্যাব, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে। কিন্তু সেইসব জায়গায় গিয়েই প্রতারিত হচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।

ভবিষ্যতে নিজেদের চিকিৎসার প্রয়োজনে ক্ষতি হতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করলেও অনেকে বলেছেন, সরকারি হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির পর্যাপ্ত সুবিধা এবং সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে যেতে হয় প্রাইভেট ক্লিনিকে। কিন্তু ওইসব প্রাইভেট ক্লিনিকে ডাক্তারের চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফির নামে হাতানো হয় মোটা অংকের অর্থ।

পাশাপাশি দেয়া হয় ভুয়া ও ভুল পরীক্ষার রিপোর্ট। প্রায় সময় ভুল চিকিৎসার শিকার হন রোগীরা। বিভিন্ন রোগের নামে নিরীক্ষা করা হলেও অভিজ্ঞ কোনো প্যাথলজিস্ট নেই। অনেক রোগের নিরীক্ষা করার জন্য পাঠানো হয় পাশের জেলা চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রাইভেট ল্যাবরেটরিতে। এতে মেলে না সঠিক নিরীক্ষার রিপোর্ট। ফলে আরো সংকটাপন্ন হয়ে পড়েন জটিল রোগীরা। আর নানা হয়রানির শিকার হন তাদের স্বজনরা।

কিন্তু ক্লিনিকগুলোর মালিক ও কর্তৃপক্ষ এসবের কোনো কিছুই তোয়াক্কা করেন না। আবার একেক ক্লিনিকের চিকিৎসা ও নিরীক্ষা ফি একেক রকমের। বিশেযজ্ঞ ডাক্তারের নামে চিকিৎসা ফি নেয়া হয় ৮-১২শ’ টাকা। আর ম্যালেরিয়া, টায়ফয়েড,এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রাফিসহ বিভিন্ন জটিল রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে আদায় করা হয়ে থাকে ৮-১৫শ’ টাকা।

এ ব্যাপারে সরাসরি যোগাযোগ করলে জেলার সিভিল সার্জন ডা. স্নেহ কান্তি চাকমা বলেন, শহরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় যেসব প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বসানো হয়েছে সেগুলো সব বাণিজ্যিক। ওইসব প্রাইভেট চেম্বার ও সেন্টারে মূলত চিকিৎসার নামে হাতানো হয় মোটা অংকের টাকা। ফলে ব্যাপক হয়রানির শিকার হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।

তিনি আরো বলেন, আর এসব কাজে জড়িত জেলা স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত কিছু সংখ্যক সরকারি চিকিৎসক ও স্টাফ। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধের জন্য জড়িতদের অনেককে একাধিকবার শোকজও করেছি। এরপরও প্রতিকার মিলছে না।   

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাখাওয়াৎ হোসেন রুবেল বলেন, রাঙামাটির প্রায় প্রাইভেট ক্লিনিক ও প্যাথলজিতে অনভিজ্ঞ প্যাথলজিস্ট দিয়ে বিভিন্ন রোগের নিরীক্ষা করা হয়। এজন্য অনেক ক্ষেত্রে দেয়া হয় ভুল রিপোর্ট। পাশাপাশি অনেক রোগী চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসার শিকারও হচ্ছেন। ফলে অনেকে জীবনহানির সম্মুখীন হন।

Rangamati

পরে চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ বাইরে বিভিন্ন জায়গায় বাধ্য হয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ব্যয় হয় বিপুল অর্থ। এতে বিভিন্ন সময়ে লোকজন চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারি নেই বললেই চলে। প্রতিকারের জন্য দরকার কঠোর ব্যবস্থা।

রোগীর স্বজন শহরের রিজার্ভবাজার এলাকার বাসিন্দা ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নূর মো. কাজল বলেন, মাস দু’য়েক আগে জ্বরে আক্রান্ত হন তার স্ত্রী জেসমিন বেগম। জ্বরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পরে নিয়ে যান শহরের বনরূপার ‘রাঙামাটি ডায়াগনস্টিক’ সেন্টারে। সেখানে রোগীকে প্রাইভেট চিকিৎসা দেন ডা. মংক্যচিং চৌধুরী সাগর নামে এক সরকারি চিকিৎসক।

কাজল বলেন, সেখানে শারীরিক অবস্থা দেখার পর আমার স্ত্রীর রক্ত পরীক্ষা করানো হয়। পরীক্ষার রিপোর্টে জানানো হয় রোগীর টায়ফয়েড পজেটিভ। চিকিৎসার জন্য টায়ফয়েডের ওষুধ দেন চিকিৎসক। কিন্তু ডাক্তারের দেয়া কোর্স অনুযায়ী কয়েক দিন ধরে নিয়মিত ওষুধ খেলেও রোগ ছাড়ার পরিবর্তে রোগীর অবস্থার দিন দিন অবনতি ঘটে। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জীবানুনাশক ওষুধ (অ্যান্টিবায়েটিক) খেয়ে এক পর্যায়ে মাথায় বিষ ওঠে রোগীর অবস্থা চরম অবনতি হয়ে একেবারে মুমুর্ষ হয়ে পড়ে।

এতে রোগীকে দ্রুত চট্টগ্রাম নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে রক্ত পরীক্ষা করে বলা হয়, রোগীর দেহে টায়ফয়েড পজেটিভ নেই। ওটা বায়ু দূষণজনিত ভাইরাস জ্বর। চিকিৎসায় সপ্তাহের মধ্যেই রোগ ছেড়ে সুস্থ হয়ে ওঠে রোগী। কিন্তু রাঙামাটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভুল চিকিৎসার কারণে সামান্য জ্বরে রোগীকে বাঁচাতে আমার এক লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে।    

লেক সাইট হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশন করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করে শহরের ভেদভেদী মুসলিমপাড়ার সাহিদা বেগম (২৫) নামে এক প্রসূতি।তিনি বলেন, বিষয়টি তার বাবা সাহেব আলী সিভিল সার্জনকে জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে অবগত বলে জানিয়ে সিভিল সার্জন ডা. স্নেহ কান্তি চাকমা বলেন, বিষয়টির ব্যাপারে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এসএস/এমএস