আইএস’র প্ররোচনায় মংডু বিজিপি ক্যাম্পে হামলা
২০১২ সালের জাতিগত দাঙ্গার পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ মংডু ও আশপাশের এলাকায় চরমভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন মুসলমানরা। প্রতিদিন কোনো না কোনো গ্রামে এক থেকে একাধিক জন রোহিঙ্গা বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হচ্ছেন।
অবরুদ্ধ জীবন কাটাচ্ছেন অসংখ্য গ্রামের হাজারো আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। ক্রমে চলে আসা এসব নির্যাতনে অতিষ্ট নিরুপায় রোহিঙ্গারা জীবনের তাগিদে একাট্টা হয়ে মংডুর বিজিপি ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে। তবে তাদের মনোবল শক্তে কাজ করেছে আফগান ফেরত কয়েকজন আইএস সদস্য।
আইএস’র কয়েক সদস্য মাস ছয়েক আগে মংডুতে পৌছে অধিকার আদায়ে রোহিঙ্গাদের একতা বদ্ধ করেছে। এমনটি দাবি করেছে আক্রান্ত মংডু এলাকার অসমর্থিত একাধিক সূত্র।
তবে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক একটি টিমের আরাকান প্রদেশ সফর বানচাল করতে এটি সাজানো হামলা বলেও দাবি করেছে অপর একটি সূত্র। কিন্তু সে দেশের সরকারি কোনো সূত্র এসব দাবি সমর্থন করেনি।
সূত্রের দাবি মতে, সম্পূর্ণ দেশীয় অস্ত্রে (দা, খন্তি, ছুরিসহ নানা অস্ত্র) পরিকল্পিত হামলা চালায় তিন ভাগে ভাগ হওয়া ১৫০-৬০ জনের রোহিঙ্গা দল। তাদের মাঝে ৮০-৯০ জনের দলটি হামলা করে মংডুর কাউয়ার বিল বিজিপি হেড কোয়ার্টারে। সেখান থেকে ৬৩টি বিজিপি ব্যবহৃত অস্ত্র লুট করে হামলাকারীরা। পরে সেই অস্ত্র দিয়েই বিজিপির উপর হামলা চালায় তারা।
সূত্র মতে, মংডু হেড কোয়ার্টার থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে নাপ্পুরা ও প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে রাছিধং থানার ধুমছাপাড়া বিজিপি ক্যাম্পে এক সাথেই হামলার ঘটনা ঘটে। অস্ত্র লুটের পর রাত সাড়ে তিনটার দিকে ফায়ার করে হামলাকারীরা।
এ ঘটনার জের ধরে পুরো আরাকান প্রদেশে অতিরিক্ত আর্মি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তারা হামলাকারী ধরার নামে গ্রামে গ্রামে অভিযান চালিয়ে সব বয়সী নারী-পুরুষকে নির্যাতন চালাচ্ছে। সোমবার বেলা ১০টার দিকে মংডুর বুরা সিকদারপাড়ায় অভিযানে যায় আর্মি পুলিশ দল। তারা সামনে যাকে পাচ্ছে তাকে নির্যাতন করছে দেখে পাড়ালিয়ারা জড়ো হয়ে পুলিশকে প্রতিরোধ করে। এতে পুলিশ গুলি চালালে ২ নারীসহ ৫ জন মারা যান। আহত হন আরো অসংখ্য। এরপরও এলাকার সাধারণ মানুষ পিছু না হঠায় শেষ মেষ মিয়ানমার পুলিশই গ্রাম ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। একই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে সমবনিয়া গ্রাম ও কাইন্দাপাড়ায়। সেখানেও আর্মি পুলিশের গুলিতে ৮ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা এখানে অনেক। এমনটি দাবি সীমান্তের ওপারের সূত্রটির।
তবে অপর একটি সূত্র দাবি করেছে, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশ পরিদর্শনে আসার কথা জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক একটি উচ্চ পর্যায়ের টিমের। সেই টিমের পরিদর্শন বানচাল করতে রাখাইনদের স্বশস্ত্র গ্রুপ আরাকান আর্মি বিজিপির পরামর্শে এ হামলার নাটকটি সাজিয়েছে। ঘটনার পর পরই আরাকান পুলিশ অপরাধী ধরার নামে মুসলমান নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশ্ব মিডিয়া ও স্থানীয় গণমাধ্যমকে রাখাইন প্রদেশের মংডুতে বর্ডার গার্ড পুলিশের তিনটি নিরাপত্তা চৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার সত্যতা নিশ্চিত করলেও কারা করেছে তা নিশ্চিত করে বলেনি।
এছাড়া সেখানকার সংবাদপত্রে ৯ বিজিপি সদস্য নিহতের খবর ছাপা হয়েছে। উল্লেখ করা হয়েছে ৩ ক্যাম্প থেকে প্রচুর অস্ত্র গোলাবারুদ লুট হয়েছে।
মংডু থেকে মুঠোফোনে একজন প্রত্যক্ষদর্শী, রোববার ঘটনাস্থল থেকে ৯ বিদ্রোহীর লাশ মংডু হাসপাতালে আনতে দেখেছেন বলে দাবি করেন।
টেকনাফ ২ বিজিবির কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ মংডুতে হামলার কারণ ও অন্যান্য বিষয়ে অবগত নন উলেখ করে জানিয়েছেন, সন্ত্রাসী ও আতঙ্কিত মিয়ানমার নাগরিকরা বাংলাদেশে যেন অনুপ্রবেশ করতে না পারে এ জন্য সীমান্তে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
অনাকাঙ্খতি ঘটনা এড়াতে নাফ নদীতে মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এ কারণে সোমবার সারাদিন বাংলাদেশের কোনো জেলে নাফ নদীতে মাছ শিকারে নামেনি।
অপরদিকে, মংডুতে হামলার পর সেখানে আটকাপড়া ১৮ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সোমবার দেশে ফিরেছে। সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে টেকনাফ স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন দিয়ে তারা ফিরে আসেন।
টেকনাফ ইমিগ্রেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, ১৮ ব্যবসায়ী ও দুই শিশুসহ ২০ জনকে সোমবার মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ একটি ট্রলারে ফিরে আসার ব্যবস্থা করেন। দ্বিতীয় দিনের মতো বন্ধ ছিল ট্রানজিট ঘাট। মিয়ানমারের পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত এটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে উল্লেখ করেছেন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা।
ফিরে আসা ব্যবসায়ীদের মতে, মংডু শহরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিপুল সংখ্যক সেনা ও সরকারি বাহিনীর আনাগোনা লক্ষ্য করেছেন তারা। তারা মূলত গতকাল মংডুর বিভিন্ন হোটেলে অবরুদ্ধভাবে অবস্থান করছিলেন।
মিয়ানমার ফেরত বাংলাদেশি সিরাজুল ইসলাম ও উসমান জানান, মংডুতে হামলার ঘটনার পর থেকে আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। কারো সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সোমবার মিয়ানমার ইমিগ্রেশন বিভাগ একটি ট্রলারে দুই শিশুসহ ২০ জনকে উঠিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। দেশে চলে আসতে পেরে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন তারা।
এদিকে, চলতি বছরের মে মাসে টেকনাফের শরণার্থী ক্যাম্পের আনসার ব্যারাকে হামলা চালিয়ে একজনকে হত্যা এবং ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫ শতাধিক গুলি লুটের ঘটনার কূল কিনারা না হয়ে প্রতিবেশী মিয়ানমারের সীমান্ত শহরে বিজিপি ক্যাম্পে হামলার পর সীমান্তে বসবাসকারীদের মাঝে উৎকন্ঠা বিরাজ করছে।
সায়ীদ আলমগীর/এমএএস/আরআইপি